বিশ্বজুড়ে আধুনিক ব্যবসায়িক প্রক্রিয়ায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর ব্যবহার দিন দিন জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। তবে বীমা সেবার মতো স্পর্শকাতর ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তির প্রয়োগ নিয়ে সাধারণ গ্রাহকদের মনে এখনো বড় ধরনের সংশয় ও অবিশ্বাস রয়ে গেছে। সাম্প্রতিক একাধিক বৈশ্বিক গবেষণায় দেখা গেছে, বীমা কোম্পানিগুলো যদি এআই ব্যবহারের বিষয়টি পরিষ্কারভাবে গ্রাহকদের সামনে ব্যাখ্যা না করে, তবে তারা অন্য প্রতিষ্ঠানে চলে যেতে একটুও দ্বিধা করছেন না। অথচ এক অদ্ভুত বিপরীত চিত্র লক্ষ্য করা গেছে করপোরেট দুনিয়ায়; সাধারণ মানুষ এআই নিয়ে সন্দিহান হলেও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে এই প্রযুক্তির গ্রহণযোগ্যতা ক্রমান্বয়ে বাড়ছে।
স্মার্ট কমিউনিকেশনস এলএলসি-এর ২০২৬ সালের ‘কাস্টমার এক্সপেরিয়েন্স বেঞ্চমার্ক’ প্রতিবেদন অনুযায়ী, বীমা সেবায় যোগাযোগ বা লেনদেনের সময় এআই-এর ব্যবহার মাত্র ৩৮ শতাংশ গ্রাহকের কাছে দরকারী বা সহায়তামূলক মনে হয়েছে। অর্থাৎ, এক বিরাট অংশ এখনো এই প্রযুক্তির কৃত্রিম সেবা নিয়ে পুরোপুরি সন্তুষ্ট নন। এই সংস্থার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা লেই সেগাল মনে করেন, প্রযুক্তির আধুনিকায়নের সাথে সাথে গ্রাহকদের প্রত্যাশাও আকাশচুম্বী হচ্ছে, কিন্তু অনেক ব্যবস্থাপনাই তার সাথে তাল মেলাতে পারছে না। তিনি স্পষ্ট জানান, যোগাযোগে সামান্য ঘাটতি থাকলে গ্রাহকেরা মুহূর্তেই অন্য কোম্পানির দিকে ঝুঁকছেন এবং এআই-এর ওপর ভরসা করার ক্ষেত্রে তারা এখন অনেক বেশি সতর্ক।
তথ্যের গোপনীয়তা ও স্বচ্ছতার চরম সংকট
বীমা গ্রাহকদের এই অনীহার পেছনে মূল কারণ হিসেবে কাজ করছে তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষা এবং স্বচ্ছতার অভাব। সমীক্ষায় অংশ নেওয়া ৮৪ শতাংশ গ্রাহক মনে করেন, তাদের সাথে যোগাযোগের সময় যদি কোনো এআই বা বট ব্যবহার করা হয়, তবে কোম্পানিগুলোর উচিত তা আগেভাগেই সততার সাথে প্রকাশ করা। এছাড়া প্রায় ২৯ শতাংশ গ্রাহক কেবল তথ্যের সুরক্ষার অভাব এবং অস্পষ্টতার কারণে তাদের আগের বীমা কোম্পানির সাথে সব ধরনের সম্পর্ক চুকিয়ে দিয়েছেন।
গ্রাহক ধরে রাখার ক্ষেত্রে আরেকটি বড় বাধা হলো দুর্বল যোগাযোগ ব্যবস্থা। বিশ্বব্যাপী প্রায় ৬৩ শতাংশ গ্রাহক জানিয়েছেন, বীমা কোম্পানির তথ্য আদান-প্রদান এবং যোগাযোগের মান আশানুরূপ না হলে তারা প্রতিষ্ঠান বদলে ফেলবেন। সিঙ্গাপুরের মতো উন্নত প্রযুক্তির দেশে এই হার আরও বেশি, প্রায় ৬৭ শতাংশ। মাত্র অর্ধেক গ্রাহক বীমা কোম্পানিগুলোর সামগ্রিক যোগাযোগ মাধ্যমকে ‘ভালো’ বা ‘চমৎকার’ বলে রেটিং দিয়েছেন। সাধারণ মানুষের মূল অভিযোগ হলো—কোম্পানিগুলোর পাঠানো বার্তাগুলো অনেক সময় অস্পষ্ট থাকে, তাদের ফরমগুলো বেশ জটিল এবং বিভিন্ন ডিজিটাল মাধ্যমের মধ্যে কোনো সমন্বয় থাকে না।
এক নজরে গবেষণা ও সমীক্ষার গুরুত্বপূর্ণ পরিসংখ্যান
স্মার্ট কমিউনিকেশনস এবং হাওডেন গ্রুপের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে এআই ব্যবহার, গ্রাহক আচরণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক দৃষ্টিভঙ্গির যে চিত্র উঠে এসেছে, তা নিচে একটি টেবিলের মাধ্যমে তুলে ধরা হলো:
| ক্রমিক | সমীক্ষার বিষয় ও গ্রাহক/কর্মকর্তাদের দৃষ্টিভঙ্গি | পরিসংখ্যান (হার) |
| ১. | বীমা সেবায় এআই-এর ব্যবহারকে দরকারী মনে করা গ্রাহক | ৩৮% |
| ২. | এআই ব্যবহারের বিষয়টি কোম্পানি কর্তৃক প্রকাশের দাবিদার গ্রাহক | ৮৪% |
| ৩. | তথ্যের গোপনীয়তা ও স্বচ্ছতার অভাবে বীমা কোম্পানি ত্যাগ করা গ্রাহক | ২৯% |
| ৪. | দুর্বল যোগাযোগের কারণে বীমা কোম্পানি পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা বৈশ্বিক গ্রাহক | ৬৩% |
| ৫. | যোগাযোগ ব্যবস্থার ত্রুটির কারণে কোম্পানি পরিবর্তনে রাজি সিঙ্গাপুরের গ্রাহক | ৬৭% |
| ৬. | বীমা কোম্পানির বর্তমান যোগাযোগ ব্যবস্থাকে ‘ভালো বা চমৎকার’ ভাবা গ্রাহক | ৫০% |
| ৭. | স্বাস্থ্যসেবায় (রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা) এআই-কে বিশ্বাস করা এশীয় কর্মী | ৬৪% |
| ৮. | সাম্প্রতিক স্বাস্থ্যসেবার অভিজ্ঞতায় এআই-এর মুখোমুখি হওয়া কর্মী | ৩৮% |
| ৯. | স্বাস্থ্য ও স্ক্রিনিং খাতে এআই-এর আরও ব্যাপক ব্যবহার প্রত্যাশী নিয়োগকর্তা | ৪৫% |
| ১০. | এআই-এর ব্যবহার নিয়ে একেবারেই ভাবছেন না এমন নিয়োগকর্তা | ৩% |
| ১১. | সাধারণ মূল্যস্ফীতি ছাড়া এশিয়ায় চিকিৎসা খাতের সম্ভাব্য মূল্যস্ফীতির হার | ১১.৪% |
| ১২. | চিকিৎসা ব্যয় আরও বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা করছেন এমন নিয়োগকর্তা | ৫১% |
বিপরীত চিত্র: স্বাস্থ্য ও করপোরেট খাতে এআই-এর জনপ্রিয়তা
গ্রাহকদের এই অবিশ্বাসের বিপরীতে হাওডেন গ্রুপের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, করপোরেট কর্মীরা স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে এআই-এর ওপর বেশ ভালোই ভরসা রাখছেন। এশিয়ার প্রায় ৬৪ শতাংশ কর্মী রোগ নির্ণয়, চিকিৎসা এবং বীমা দাবি মেটানোর ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহারকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন।
হাওডেন এমপ্লয়ি বেনিফিটস-এর এশিয়া অঞ্চলের পরিচালক ক্রিস্টিন উই বলেন, স্বাস্থ্যসেবায় এআই-এর ব্যবহার যত বাড়বে, নিয়োগকর্তাদের দায়িত্বও তত বাড়বে। কর্মীরা মূলত জানতে চান এই প্রযুক্তি কীভাবে তাদের চিকিৎসায় সাহায্য করছে এবং তাদের ব্যক্তিগত তথ্য কীভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। বর্তমানে ৪৫ শতাংশ নিয়োগকর্তা চান রোগ নির্ণয় ও স্ক্রিনিংয়ের মতো কাজে এআই-এর ব্যবহার আরও বাড়ুক। বীমা দাবি প্রক্রিয়াকরণ, বড় অঙ্কের খরচের পূর্বাভাস দেওয়া এবং ভার্চুয়াল ডাক্তারের পরামর্শের মতো ক্ষেত্রেও এই প্রযুক্তির প্রয়োগ জনপ্রিয় হচ্ছে। এশিয়ার চিকিৎসা খাতের মূল্যস্ফীতি যেখানে ১১.৪ শতাংশ ছোঁয়ার পূর্বাভাস রয়েছে, সেখানে চিকিৎসায় এআই-এর সঠিক ব্যবহার খরচ কমাতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। তাই প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে বীমা খাতের কোম্পানিগুলোকে এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে আরও বেশি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক হতে হবে।
