চীনে দ্রুত বয়স্ক জনসংখ্যা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে প্রবীণ সেবা ও সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার ভেতরে জমে থাকা এক গভীর সংকট সম্প্রতি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে—ভুয়া মানসিক হাসপাতাল, জাল ভর্তি প্রক্রিয়া এবং সরকারি স্বাস্থ্য বিমা তহবিল লুটের বিস্তৃত নেটওয়ার্ক, যা দেশের প্রবীণ সুরক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতা নগ্নভাবে প্রকাশ করছে। এই প্রতারণার সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছেন দরিদ্র, একাকী ও সামাজিকভাবে প্রান্তিক প্রবীণরা, যাদের পক্ষে নিজেদের অধিকার রক্ষা করা প্রায় অসম্ভব।
একটি প্রভাবশালী চীনা গণমাধ্যমের অনুসন্ধানে জানা যায়, হুবেই প্রদেশের শিয়াংইয়াং ও ইচাং শহরে অন্তত এক ডজন বেসরকারি মানসিক হাসপাতাল দীর্ঘদিন ধরে সন্দেহজনক পদ্ধতিতে রোগী ভর্তি করছে। এসব প্রতিষ্ঠানে প্রকৃত মানসিক রোগ নির্ণয় ছাড়াই সাধারণ মানুষকে রোগী হিসেবে নথিভুক্ত করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রবীণদের সামান্য অর্থ, নিয়মিত খাবার বা বিনা খরচে থাকা–চিকিৎসার প্রলোভন দেখিয়ে হাসপাতালে আনা হয়। পরে কাগজপত্রে দেখানো হয় যে তারা পূর্ণাঙ্গ মানসিক চিকিৎসা পাচ্ছেন, যার ভিত্তিতে প্রতিদিন রোগীপ্রতি প্রায় ১৪০ ইউয়ান চিকিৎসা ব্যয় সরকারি স্বাস্থ্য বিমা তহবিল থেকে আদায় করা হয়।
গোপন অনুসন্ধানে আরও ভয়াবহ তথ্য উঠে আসে। কোনো কোনো হাসপাতালে বাস্তবে রোগীর সংখ্যা হাতে গোনা হলেও নথিতে শতাধিক রোগী দেখানো হয়েছে। তথাকথিত এসব রোগীর বড় অংশ গ্রামাঞ্চলের প্রবীণ মানুষ কিংবা মদ্যপানে আসক্ত ব্যক্তি, যাদের প্রকৃত মানসিক রোগ নেই। অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের সম্মতি নেওয়া হয়নি, এমনকি আইনি প্রক্রিয়াও মানা হয়নি। ফলে তারা কার্যত জোরপূর্বক হাসপাতালে আটকে পড়ছেন।
এই হাসপাতালগুলোর ভেতরের পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। বিভিন্ন অভিযোগে জানা গেছে, রোগীদের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। কাউকে হাসপাতাল পরিষ্কার, কাউকে অন্য রোগীদের গোসল করানো বা তুচ্ছ শ্রমে বাধ্য করা হয়েছে। সবচেয়ে করুণ দিক হলো—একবার ভর্তি হওয়ার পর অনেক প্রবীণের পক্ষেই হাসপাতাল ত্যাগ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। কেউ কেউ বছরের পর বছর সেখানে আটকে থাকেন, পরিবার বা বাইরের জগতের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগও সীমিত হয়ে পড়ে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘটনা চীনের প্রবীণ সেবা ব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতারই প্রতিফলন। দেশটিতে দীর্ঘদিন ধরে প্রবীণদের দেখভালের দায়িত্ব মূলত পরিবারের ওপর ন্যস্ত বলে ধরা হয়। কিন্তু বাস্তবে গ্রামাঞ্চলে পেনশন অপ্রতুল, সামাজিক সেবা সীমিত এবং কর্মক্ষম তরুণেরা শহরমুখী হওয়ায় বহু গ্রাম প্রায় জনশূন্য হয়ে পড়েছে। ফলে অসংখ্য প্রবীণ মানুষ একাকী ও অসহায় অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন, যা এই ধরনের প্রতারণার জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করছে।
প্রতিবেদনের মূল তথ্যসংক্ষেপ
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| সংশ্লিষ্ট এলাকা | শিয়াংইয়াং ও ইচাং, হুবেই প্রদেশ |
| হাসপাতালের ধরন | বেসরকারি মানসিক হাসপাতাল |
| দৈনিক চিকিৎসা ব্যয় (দেখানো) | রোগীপ্রতি প্রায় ১৪০ ইউয়ান |
| প্রধান ভুক্তভোগী | দরিদ্র ও একাকী প্রবীণ, মদ্যপানে আসক্ত ব্যক্তি |
| মূল অভিযোগ | ভুয়া ভর্তি, স্বাস্থ্য বিমা জালিয়াতি, নির্যাতন |
বিশ্লেষকদের সতর্কতা হলো—জনসংখ্যার দ্রুত বার্ধক্য এবং সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা দ্রুত সংস্কার না করা হলে ভবিষ্যতে এ ধরনের কেলেঙ্কারি আরও বিস্তৃত আকার ধারণ করতে পারে। প্রবীণদের জন্য বিকল্প আবাসন, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, স্থানীয় পর্যায়ের কঠোর নজরদারি এবং স্বচ্ছ স্বাস্থ্য বিমা ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা না গেলে এই সংকট চীনের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক চ্যালেঞ্জে রূপ নেবে।
