নাগপুরে ১০০ বছরের বিমা বিতর্ক

মহারাষ্ট্রের নাগপুর শহরে ৯০ বছর বয়সী এক প্রবীণ গ্রাহকের নামে ১০০ বছর মেয়াদি জীবনবিমা পলিসি ইস্যুর অভিযোগ ঘিরে রাষ্ট্রায়ত্ত একটি ব্যাংকের শাখা ব্যবস্থাপককে কেন্দ্র করে তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর গ্রাহক সুরক্ষা, ‘মিস-সেলিং’, অবহিত সম্মতি এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নৈতিক দায়বদ্ধতা নিয়ে দেশজুড়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং আর্থিক পণ্য বিক্রির প্রক্রিয়ায় কাঠামোগত দুর্বলতার ইঙ্গিত বহন করতে পারে।

অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৪ সালে সংশ্লিষ্ট শাখার দীর্ঘদিনের এক প্রবীণ গ্রাহকের নামে এমন একটি জীবনবিমা পরিকল্পনা নেওয়া হয়, যার মেয়াদ ১০০ বছর এবং ম্যাচিউরিটি নির্ধারিত ২১২৪ সালে—অর্থাৎ পলিসিধারীর বয়স ১৯০ বছর পূর্ণ হলে। বার্ষিক প্রিমিয়াম ধার্য করা হয় ২ লাখ টাকা। ইতোমধ্যে দুই বছরে মোট ৪ লাখ টাকা গ্রাহকের ব্যাংক হিসাব থেকে কেটে নেওয়া হয়েছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে তৃতীয় কিস্তির নোটিফিকেশন পাওয়ার পর পরিবারের সদস্যরা বিষয়টি জানতে পারেন এবং তৎক্ষণাৎ আপত্তি তোলেন।

পরিবারের দাবি, সংশ্লিষ্ট শাখা ব্যবস্থাপক পূর্বপরিচয়ের সুযোগ নিয়ে প্রবীণ গ্রাহকের আস্থা অর্জন করেন এবং পলিসিটিকে ‘অত্যন্ত প্রয়োজনীয়’ হিসেবে উপস্থাপন করেন। শারীরিকভাবে দুর্বল ওই ব্যক্তি নিজে নথিপত্র পূরণ করতে অক্ষম থাকায় ব্যাংকের কর্মীরাই ফর্ম পূরণ করেন। এতে স্বচ্ছতা, যথাযথ যাচাই (ডিউ ডিলিজেন্স) এবং অবহিত সম্মতির প্রশ্ন সামনে আসে। আর্থিক খাতের বিশেষজ্ঞরা বলেন, ৬০ বছরের ঊর্ধ্ব গ্রাহকের ক্ষেত্রে জটিল বা দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক পণ্য বিক্রির আগে ঝুঁকি-প্রোফাইল, আয়-ব্যয়, আর্থিক লক্ষ্য ও স্বাস্থ্য পরিস্থিতি বিশদভাবে মূল্যায়ন করা বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত।

প্রিমিয়াম ও পলিসির সারসংক্ষেপ

বিষয়বিবরণ
গ্রাহকের বয়স৯০ বছর
পলিসির মেয়াদ১০০ বছর (ম্যাচিউরিটি ২১২৪)
বার্ষিক প্রিমিয়াম২,০০,০০০ টাকা
পরিশোধিত প্রিমিয়াম৪,০০,০০০ টাকা (দুই বছরে)
উত্থাপিত অভিযোগমিস-সেলিং ও প্রভাবিত সম্মতি

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি ভাইরাল হলে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। অনেকে একে ‘প্রিডেটরি সেলস প্র্যাকটিস’ আখ্যা দেন। চাপের মুখে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ হস্তক্ষেপ করে এবং কাটা প্রিমিয়ামের অর্থ গ্রাহকের হিসাবে ফেরত দেওয়া হয়েছে বলে জানা যায়। তবে অর্থ ফেরত এলেও বৃহত্তর প্রশ্ন রয়ে গেছে—এমন একটি পলিসি কেওয়াইসি, আন্ডাররাইটিং ও অভ্যন্তরীণ অডিটের একাধিক ধাপ পেরিয়ে অনুমোদিত হলো কীভাবে? ১০০ বছর পরের ম্যাচিউরিটি তারিখ কি স্বয়ংক্রিয়ভাবে ‘রেড-ফ্ল্যাগ’ হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার কথা ছিল না?

ভারতের বিমা খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা Insurance Regulatory and Development Authority of India–এর সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ‘মিস-সেলিং’ সংক্রান্ত অভিযোগের সংখ্যা আড়াই লক্ষেরও বেশি, যার প্রায় অর্ধেক জীবনবিমা পণ্যকে ঘিরে। এই ঊর্ধ্বগতি সমস্যাটির পদ্ধতিগত চরিত্রের ইঙ্গিত দেয়। অন্যদিকে, Reserve Bank of India প্রবীণ গ্রাহকদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সতর্কতা, বহুস্তরীয় যাচাই এবং ঝুঁকিপূর্ণ পণ্যে ‘কুলিং-অফ’ সময়সীমা জোরদারের সুপারিশ করেছে।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, প্রযুক্তিনির্ভর সতর্কবার্তা—যেমন অস্বাভাবিক বয়স বা মেয়াদের ক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয় অ্যালার্ট—চালু করা, বাধ্যতামূলক অডিও-ভিডিও সম্মতি রেকর্ডিং সংরক্ষণ, এবং স্বাধীন তৃতীয় পক্ষের ভেরিফিকেশন ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। পাশাপাশি সেলস টার্গেটের অতিরিক্ত চাপ কমিয়ে নৈতিক বিক্রয়চর্চা জোরদার না করলে এ ধরনের ঘটনা থামানো কঠিন হবে। নাগপুরের এই বিতর্ক তাই কেবল একটি শাখার সীমাবদ্ধতা নয়; আর্থিক খাতে আস্থার ভিত্তি কতটা দৃঢ়—তারও এক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।

মন্তব্য করুন