প্রিমিয়াম ছাপিয়ে দাবি বৃদ্ধি: চরম চাপে ইন্দোনেশিয়ার ক্রেডিট বীমা খাত

চলতি ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি থেকে মার্চ) ইন্দোনেশিয়ার সাধারণ বীমা খাত এক বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়েছে। দেশটির ক্রেডিট বীমা ব্যবসায় প্রিমিয়াম আয়ের চেয়ে গ্রাহকদের পক্ষ থেকে আসা দাবির পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যাওয়ায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যম ‘জাকার্তা গ্লোব’-এর এক বিশেষ প্রতিবেদনে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই দ্বীপরাষ্ট্রটির বীমা খাতের সাম্প্রতিক এই উদ্বেগের চিত্র বিশদভাবে উঠে এসেছে।

ইন্দোনেশিয়ান জেনারেল ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশনের (এএইউআই) সাম্প্রতিক প্রাতিষ্ঠানিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বছরের প্রথম তিন মাসে ক্রেডিট বীমার ‘লস রেশিও’ বা লোকসানের অনুপাত বেড়ে ১০২ শতাংশে ঠেকেছে। সহজ ভাষায় বলতে গেলে, এই নির্দিষ্ট সময়ে বীমা কোম্পানিগুলো গ্রাহকদের কাছ থেকে প্রিমিয়াম বাবদ মোট যত টাকা রাজস্ব আয় করেছে, তার চেয়ে অনেক বেশি টাকা তাদের গ্রাহকদের বীমা দাবি মেটাতে পকেট থেকে পরিশোধ করতে হয়েছে। আয় ও ব্যয়ের এই ভারসাম্যহীনতা পুরো খাতকে খাদের কিনারে এনে দাঁড় করিয়েছে।

পরিসংখ্যানের চোখে আয় ও ব্যয়ের বড় ব্যবধান

বছরের প্রথম প্রান্তিকে ইন্দোনেশিয়ার ক্রেডিট বীমা খাতে মোট উত্থাপিত ও পরিশোধিত দাবির পরিমাণ গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এক ধাক্কায় ১৭ শতাংশ বেড়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রার অঙ্কে এর পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৩ কোটি ৫২ লাখ মার্কিন ডলার, যা স্থানীয় মুদ্রায় ৪.২ ট্রিলিয়ন ইন্দোনেশিয়ান রুপিয়ার সমান। হঠাৎ করে দাবির এই উল্লম্ফন সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে স্থানীয় কোম্পানিগুলো।

অন্যদিকে, দাবির হার যেভাবে লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েছে, সেই তুলনায় কিন্তু নতুন প্রিমিয়াম থেকে আয় মোটেও বাড়েনি। জানুয়ারি থেকে মার্চ মাসের মধ্যে এই খাতে প্রিমিয়াম আয় বেড়েছে মাত্র ৩.২ শতাংশ। এই সামান্য ও ধীরগতির বৃদ্ধির পর মোট প্রিমিয়াম আয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২২ কোটি ৯৬ লাখ মার্কিন ডলার, যা স্থানীয় মুদ্রায় ৪.১ ট্রিলিয়ন ইন্দোনেশিয়ান রুপিয়া। ক্রেডিট বীমা খাতের আয় ও ব্যয়ের এই বড় অমিল এবং ঘাটতি পুরো সাধারণ বীমা বাজারকে এক ধরণের অদৃশ্য কিন্তু তীব্র আর্থিক চাপের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে, যা সামগ্রিক অর্থনীতিকেও প্রভাবিত করতে পারে।

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বনাম সাধারণ মানুষের প্রকৃত সক্ষমতা

আশ্চর্যের বিষয় হলো, ইন্দোনেশিয়ার সামগ্রিক সামষ্টিক অর্থনীতিতে বর্তমানে একটি তুলনামূলক স্থিতিশীল ও ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি বজায় রয়েছে। তবে দেশের অর্থনীতিবিদ ও বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এই সামষ্টিক অর্থনৈতিক উন্নতির সুফল এখনো সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় বা তৃণমূল পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছায়নি। দেশের মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারগুলোর প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কিংবা ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসাগুলোর আর্থিক ভিত এখনো অভ্যন্তরীণভাবে পুরোপুরি শক্তিশালী হতে পারেনি।

এর পাশাপাশি বাজারে সুদের উচ্চ হারও আর্থিক লেনদেনের ক্ষেত্রে একটি বড় সংকট তৈরি করছে। ঋণের বিপরীতে সুদের হার অনেক বেশি থাকায় সাধারণ মানুষের পক্ষে সময়মতো ব্যাংক বা বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাসিক কিস্তি ও ঋণ শোধ করা কঠিন হয়ে পড়ছে। এর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব গিয়ে পড়ছে ঋণের বিপরীতে নেওয়া ক্রেডিট বীমাগুলোর ওপর। গ্রাহকেরা ঋণ খেলাপিতে পরিণত হওয়ায় চুক্তি অনুযায়ী বীমা কোম্পানিগুলোকে সেই ঋণের পুরো দায়ভার নিজের কাঁধে নিতে হচ্ছে এবং একের পর এক বড় অঙ্কের দাবি পরিশোধ করতে হচ্ছে। ফলে ব্যাংকগুলোকে সুরক্ষিত রাখার দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে উল্টো বীমা খাতের নিজেদের অভ্যন্তরীণ মুনাফাই এখন বড় ধরণের ঝুঁকির মুখে পড়েছে। আগামী প্রান্তিকগুলোতে এই পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি না হলে দেশটির গোটা আর্থিক ও ঋণ ব্যবস্থায় নতুন জটিলতা তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

মন্তব্য করুন