আরও পাঁচ জীবন বীমা প্রতিষ্ঠানের দাবি মেটানোর উদ্যোগ

দীর্ঘদিন ধরে বকেয়া থাকা বীমা দাবি পরিশোধের ধারাবাহিক উদ্যোগের অংশ হিসেবে আরও পাঁচটি জীবন বীমা কোম্পানির গ্রাহকদের প্রায় ২১ কোটি টাকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)। আগামী ৫ অক্টোবর এসব দাবি পরিশোধের কথা রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে তিনটির পরিশোধযোগ্য দাবির অর্থ ইতোমধ্যে নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে হোমল্যান্ড লাইফ ইন্স্যুরেন্স ৪ কোটি ৮২ লাখ টাকা, প্রগ্রেসিভ লাইফ ইন্স্যুরেন্স ৬ কোটি ৭৮ লাখ টাকা এবং পদ্মা ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স ৮ কোটি ৮২ লাখ টাকা পরিশোধ করবে। অন্য দুই প্রতিষ্ঠান সানফ্লাওয়ার লাইফ ইন্স্যুরেন্স ও সানলাইফ ইন্স্যুরেন্সের কত টাকা দাবি পরিশোধ করা হবে, তা নির্ধারণে রোববার আইডিআরএর সঙ্গে বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।

এই উদ্যোগের আগে দুই দফায় আট হাজার ৪১৭ জন পলিসিধারীকে মোট ৩৭ কোটি ৫৪ লাখ টাকা বীমা দাবি পরিশোধ করা হয়েছে। এর মধ্যে গত ৩ সেপ্টেম্বর প্রথম দফায় সাতটি জীবন বীমা কোম্পানির ২ হাজার ৫৪৯ জন গ্রাহককে ১৪ কোটি ৫১ লাখ টাকা দেওয়া হয়।

প্রথম দফায় বায়রা লাইফ ইন্স্যুরেন্সের আটজন গ্রাহক ৪ লাখ ৫১ হাজার ৮২৬ টাকা এবং ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ৫২৮ জন গ্রাহক ৫ কোটি ৪২ লাখ ৮৫ হাজার ৩৬৯ টাকা পেয়েছেন। গোল্ডেন লাইফের চারজন গ্রাহককে দেওয়া হয় ২ লাখ ৫১ হাজার ৪৭৬ টাকা।

এ ছাড়া হোমল্যান্ড লাইফের ১৫ জন গ্রাহক ১০ লাখ ৬৬ হাজার ১৯১ টাকা, পদ্মা ইসলামী লাইফের ৬২৪ জন ১ কোটি ৯৪ লাখ ৯৪ হাজার ৮৫৩ টাকা, প্রগ্রেসিভ লাইফের ১ হাজার ৩৫০ জন ৬ কোটি ৯০ লাখ ৩২ হাজার ১৬৫ টাকা এবং সানফ্লাওয়ার লাইফের ২০ জন গ্রাহক ৫ লাখ ২১ হাজার ২৬৬ টাকা বীমা দাবি হিসেবে পেয়েছেন।

এরপর ১৪ সেপ্টেম্বর দ্বিতীয় দফায় আরও ৫ হাজার ৮৬৮ জন পলিসিধারীকে ২৩ কোটি ৩ লাখ ৫৬ হাজার ৯৭১ টাকা পরিশোধ করা হয়। ওই দফায় পদ্মা ইসলামী লাইফের ৩ হাজার ৬০০ গ্রাহককে ১২ কোটি টাকা, হোমল্যান্ড লাইফের ১ হাজার ১৪৫ জনকে ৪ কোটি ৯৮ লাখ ৮ হাজার ৫১৪ টাকা এবং ফারইস্ট ইসলামী লাইফের ৫৮০ জনকে ৫ কোটি টাকা দেওয়া হয়।

একই দফায় সানফ্লাওয়ার লাইফের ৩০০ গ্রাহক ৫৫ লাখ ৩০ হাজার টাকা এবং সানলাইফ ইন্স্যুরেন্সের ২৪৩ গ্রাহক ৫০ লাখ ১৮ হাজার ৪৫৭ টাকা বীমা দাবি পেয়েছেন।

বীমা খাতে দীর্ঘদিনের বকেয়া দাবি পরিশোধ না হওয়ায় পলিসিধারীদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার সাম্প্রতিক উদ্যোগের লক্ষ্য শুধু আটকে থাকা অর্থ গ্রাহকদের হাতে পৌঁছে দেওয়া নয়, বরং দাবি নিষ্পত্তির প্রক্রিয়ায় গতি আনা এবং গ্রাহকদের আস্থা ফিরিয়ে আনা।

তবে এই উদ্যোগের পাশাপাশি বকেয়া দাবির সামগ্রিক পরিমাণ নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স বিভাগের চেয়ারম্যান ড. শহিদুল ইসলাম জাহীদ বলেছেন, উদ্যোগটি ইতিবাচক হলেও এর দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে সুস্পষ্ট পরিকল্পনা প্রয়োজন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, গ্রাহকদের ৭ হাজার কোটি টাকার বেশি বীমা দাবি রয়েছে। শুধু সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর সম্পদ বিক্রি করে এত বিপুল অর্থ পরিশোধ করা সম্ভব নয়।

এ কারণে আইডিআরএর স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা স্পষ্ট করার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করেন তিনি। একই সঙ্গে বর্তমানে ব্যক্তি গ্রাহকদের দাবি পরিশোধে যে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, তার পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের বকেয়া দাবির বিষয়ে কর্তৃপক্ষ কী ব্যবস্থা নেবে, সেটিও পরিষ্কার হওয়া দরকার বলে তিনি উল্লেখ করেন।

আইডিআরএর চেয়ারম্যান মীর নাদিয়া নিভিন জানিয়েছেন, পলিসিধারীদের ন্যায্য দাবি যথাসময়ে পরিশোধ নিশ্চিত করা সংস্থাটির অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার। বীমা খাতে জনগণের আস্থা পুনর্গঠনের জন্য দাবি নিষ্পত্তির গতি ও প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পলিসিধারীদের স্বার্থ সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি।

আগামী ৫ অক্টোবর আরও পাঁচটি জীবন বীমা কোম্পানির গ্রাহকদের দাবি পরিশোধের উদ্যোগ সেই ধারাবাহিকতারই পরবর্তী ধাপ। তবে বকেয়া দাবির সামগ্রিক পরিমাণ বিবেচনায় এই প্রক্রিয়া নিয়মিতভাবে কতটা এগিয়ে নেওয়া যায় এবং দীর্ঘমেয়াদে কোম্পানিগুলোর আর্থিক সক্ষমতা কীভাবে পুনর্গঠন করা হবে, তা বীমা খাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে থাকবে।

মন্তব্য করুন