গত অর্থবছরের শেষ প্রান্তিকে এসে বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে দেশের আর্থিক ও বীমা খাত। টানা কয়েক প্রান্তিক ইতিবাচক ধারায় থাকার পর হঠাৎ করেই এই খাতে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সাময়িক তথ্য অনুযায়ী, গত ২০১৬ অর্থবছরের এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে স্থির মূল্যের ভিত্তিতে এই খাতের প্রকৃত প্রবৃদ্ধি শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশ কমে ঋণাত্মক হয়ে পড়েছে।
মূল্যস্ফীতি সমন্বয়ের পর এই নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি নির্দেশ করে যে দেশের আর্থিক খাত তার আগের অগ্রগতির ধারা ধরে রাখতে পারছে না। অথচ এক বছর আগে, অর্থাৎ ২০১৫-২৬ অর্থবছরের একই প্রান্তিকে এই যুগ্ম খাতে প্রবৃদ্ধি ছিল ২.৬৪ শতাংশ।
বিবিএসের প্রকাশিত পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট দেখা যায়, ২০১৬ অর্থবছরের শুরু থেকেই আর্থিক ও বীমা খাতে প্রবৃদ্ধির গতি ক্রমশ কমছিল। প্রথম প্রান্তিকে যেখানে প্রবৃদ্ধি ছিল ৩.৫৬ শতাংশ, দ্বিতীয় প্রান্তিকে তা কমে দাঁড়ায় ২.০৫ শতাংশে। তৃতীয় প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি আরও কমে নেমে আসে ঠিক ১.০০ শতাংশে এবং চতুর্থ অর্থাৎ শেষ প্রান্তিকে এসে তা পুরোপুরি সংকুচিত হয়ে ঋণাত্মক ধারায় রূপ নেয়।
অবশ্য চলতি বাজারের মূল্যে এই শ্লথগতির ছাপ পুরোপুরি স্পষ্ট হয়নি। ২০১৬ অর্থবছরের শেষ প্রান্তিকে চলতি মূল্যে এই খাতের প্রবৃদ্ধি ৮.৯৪ শতাংশ ইতিবাচক ছিল। চলতি মূল্যে হিসাব করা জিডিপিতে এই অর্থবছরের চতুর্থ প্রান্তিকে আর্থিক ও বীমা খাতের অবদান ছিল প্রায় ৩.২২ শতাংশ।
প্রকৃত জিডিপির এই পতন সরাসরি প্রতিটি ব্যাংক বা বীমা প্রতিষ্ঠানের লাভ-ক্ষতি নির্দেশ করে না, কারণ জিডিপি মূলত একটি খাতের মোট সংযোজিত মূল্য (ভ্যালু অ্যাড) পরিমাপ করে। তা সত্ত্বেও, বর্তমান বাস্তবতায় খাতটির সার্বিক সংকট দৃশ্যমান।
অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকিং খাতের সংশিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহের ধীরগতি, আমানত ও ঋণ বিতরণে নিষ্ক্রিয়তা, খেলাপি ঋণের লাগামহীন বৃদ্ধি এবং বীমা খাতের নানা প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতাই এই সংকোচনের প্রধান কারণ। পাশাপাশি ব্যাংকগুলোর ফি বা কমিশনভিত্তিক আয় কমে যাওয়াও প্রবৃদ্ধির গতি কমিয়ে দিয়েছে।
প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন জানান, খেলাপি ঋণ আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যাওয়ায় ব্যাংকগুলোকে তাদের পরিচালন মুনাফার এক বিশাল অংশ প্রভিশন বা নিরাপত্তা সঞ্চিতি হিসেবে তুলে রাখতে হচ্ছে। ফলে পরিচালন আয় ভালো হলেও নীট মুনাফায় বড় ধস নামছে। অন্যদিকে উচ্চ মূল্যস্ফীতি সাধারণ আমানতকারীদের জমানো টাকা তুলে নিতে বাধ্য করছে, যা সামলাতে গিয়ে বেশি সুদে আমানত সংগ্রহ করতে হচ্ছে এবং ব্যাংকগুলোর তহবিল খরচ বেড়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে দীর্ঘদিন ধরে গ্রাহকদের বীমা দাবি মেটাতে দেরি হওয়ায় নতুন বীমা পলিসি বিক্রিতে চরম মন্দা দেখা দিয়েছে।
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ মাহবুবুর রহমান এ বিষয়ে জানান, বিবিএসের এই তথ্য ব্যাংকিং খাতের বর্তমান বাস্তব চিত্রটিই তুলে ধরেছে। বিগত বছরের তুলনায় ব্যাংকগুলোর আয় বহুলাংশে কমে গেছে। অধিকাংশ ব্যাংক স্বাভাবিক ঋণ কার্যক্রম না চালিয়ে অলস বসে আছে কিংবা সরকারের ট্রেজারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগের ওপর অতিরিক্ত নির্ভর হয়ে পড়ছে, যা টেকসই আর্থিক ব্যবস্থার নির্দেশক নয়।
