তীব্র তাপপ্রবাহের কবলে পড়ে ইউরোপজুড়ে ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনীতি বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ছে। দীর্ঘ সময় ধরে চলা এই তাপপ্রবাহের কারণে বিশেষ করে বিপণন, আতিথেয়তা এবং খুচরা ব্যবসা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। অথচ প্রচলিত বীমা ব্যবস্থায় তাপজনিত এই ক্ষতির তেমন কোনো কভারেজ না থাকায় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ঝুঁকি দিন দিন আরও বাড়ছে।
ঐতিহ্যবাহী ইতালীয় শহর পাদুয়ার বিখ্যাত ক্যাফেগুলো একসময় বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত খদ্দেরদের পদচারণায় মুখর থাকত। মানুষ বাইরে বসে আড্ডা দিত এবং সান্ধ্যকালীন পানীয় বা ‘অ্যাপেরিটিভো’ উপভোগ করত। তবে চলতি বছরের পঞ্চম দফার তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে সেই চিরচেনা চিত্র পাল্টে গেছে। প্রখর রোদের তাপে মানুষ এখন শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরের ভেতর আশ্রয় নিতে বাধ্য হচ্ছে। এর ফলে ব্যবসায়ীদের বিক্রি উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে।
হসপিটালিটি অ্যাসোসিয়েশন এপ্পে পাদুয়ার (APPE Padova) প্রেসিডেন্ট ফেদেরিকা লুনি জানিয়েছেন, তাপপ্রবাহের কারণে এখন আড্ডার সময় কিছুটা পেছাতে বাধ্য হচ্ছে মানুষ। এর ফলে বিকালের দিকে রেস্তোরাঁ ও ক্যাফেগুলোর বাইরের খোলা বসার জায়গা এবং টেরেসগুলো সম্পূর্ণ ফাঁকা পড়ে থাকছে। শহর ও এর আশপাশের প্রায় ছয়শটি আতিথেয়তা ব্যবসার ওপর চালানো এক জরিপে দেখা গেছে, সাম্প্রতিক তাপপ্রবাহের সময় ৮০ শতাংশেরও বেশি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের টার্নওভার বা লেনদেন প্রায় ২০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। লুনি বলেন, ২০ শতাংশের এই পতন ব্যবসার সমস্ত মুনাফা মুছে দেয়।
তাপপ্রবাহ কেবল আতিথেয়তা খাতকেই ক্ষতিগ্রস্ত করছে না, বরং পুরো ইউরোপের অর্থনীতিতে এর দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। এর ফলে শ্রমিকদের উৎপাদনশীলতা হ্রাস পাচ্ছে, ভোক্তাদের কেনাকাটার প্রবণতা কমছে এবং ব্যবসা পরিচালনার খরচ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে চলেছে। মুডিস-এর প্রকাশিত এক হিসাব অনুযায়ী, গত গ্রীষ্মে ইউরোপের তীব্র তাপপ্রবাহের ফলে অর্থনৈতিক উৎপাদনে ৪৩ বিলিয়ন ইউরো বা ৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের ক্ষতি হয়েছিল। অথচ এর বিপরীতে মাত্র প্রায় ৫০ কোটি ইউরো বা ৫০০ মিলিয়ন ইউরো বীমা দাবি হিসেবে পরিশোধ করা হয়েছিল।
বীমা কোম্পানিগুলোর জন্য এই ধরনের ক্ষতি পুষিয়ে দেওয়া বেশ কঠিন। কারণ এগুলো সচরাচর কোনো দৃশ্যমান সম্পত্তি ধ্বংসের চেয়ে পরোক্ষ ব্যবসায়িক বা অপারেশনাল বিঘ্ন থেকে উদ্ভূত হয়। মার্শ-এর জলবায়ু ও স্থায়িত্ব বিষয়ক ব্যবস্থাপনা পরিচালক সোয়েনজা সুরমিনস্কি বলেন, তাপ নিজে থেকে ঐতিহ্যগতভাবে বীমাকৃত কোনো ঝুঁকি নয়। বন্যা বা ঝড়ের মতো চরম তাপপ্রবাহ সাধারণত সচরাচর বড় ধরনের ধ্বংসাত্মক শারীরিক ক্ষতি করে না, তবে এর কারণে যে আর্থিক ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম ব্যাহত হয়, তা অত্যন্ত মারাত্মক হতে পারে।
ইউরোপীয় বীমা নিয়ন্ত্রকের ৯ হাজার ছোট ও মাঝারি আকারের ফার্মের ওপর চালানো এক জরিপে দেখা গেছে, মাত্র ২৮ শতাংশ প্রতিষ্ঠানের সম্পত্তি বীমার অংশ হিসেবে ব্যবসায়িক কার্যক্রম বিঘ্নিত হওয়ার কভারেজ রয়েছে। এছাড়া ১৭ শতাংশের কাছে ধর্মঘটের মতো ঘটনাগুলো কভার করার জন্য নন-ড্যামেজ বিজনেস ইন্টারাপশন সুরক্ষা ছিল। বর্তমান পরিস্থিতিতে ট্রেন চলাচল বিলম্বিত হওয়া, কৃষিপণ্যের ফলন কমে যাওয়া এবং কারখানার কুলিং খরচ বেড়ে যাওয়ার কারণে এই সুরক্ষার ব্যবধান আরও প্রশস্ত হচ্ছে।
তাপমাত্রা বৃদ্ধির এই সংকট একক কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি প্রায়শই খরা, দাবানল এবং পানি সংকটের মতো একাধিক ঝুঁকির সাথে মিলে এক জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় ইউরোপ সবচেয়ে দ্রুত উষ্ণ হয়ে ওঠা মহাদেশ হওয়ায় এখানে এই চ্যালেঞ্জ আরও প্রকট আকার ধারণ করেছে। রয়টার্স ক্লাইমেট মনিটরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১১ আগস্ট পশ্চিম ইউরোপের গড় তাপমাত্রা ১৯৬১ থেকে ১৯৯০ সালের গড় তাপমাত্রার তুলনায় প্রায় ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা ১৮ ডিগ্রি ফারেনহাইটের বেশি উর্ধ্বে ছিল।
পরিবেশগত তথ্য প্রকাশকারী প্ল্যাটফর্ম সিডিপি-র (CDP) সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, তাদের তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর ৩৫ শতাংশই তাপপ্রবাহকে তাদের ব্যবসার জন্য একটি বড় ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে উৎপাদন, পরিষেবা, অবকাঠামো এবং খাদ্য-সংযুক্ত খাতের ব্যবসাগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। যদিও বিদ্যুৎ বিভ্রাটের মতো ঘটনার কারণে হওয়া শারীরিক ক্ষতি কখনো কখনো বীমার আওতায় আসে, তবে ব্যবসায়ীরা বলছেন যে এই ক্ষতিপূরণ কখনই হারিয়ে যাওয়া বিক্রি বা বন্ধ হয়ে যাওয়া ব্যবসায়িক কার্যক্রমের ঘাটতি পূরণ করতে পারে না।
এই ব্যবধান দূর করার জন্য বীমাপ্রতিষ্ঠানগুলো এখন প্যারামেট্রিক বীমা পণ্যের দিকে ঝুঁকছে। এই ধরনের বীমায় তাপমাত্রা নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে ক্ষতিপূরণ প্রদান করা হয়। কেবিভি রিসার্চের (KBV Research) একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ থেকে ২০৩২ সালের মধ্যে বার্ষিক ৯.৫ শতাংশ চক্রবৃদ্ধি হারে বেড়ে ইউরোপের প্যারামেট্রিক বীমার বাজার ২০৩১ সালের মধ্যে ৭.৯৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে বলে আশা করা হচ্ছে। কৃষিখাতে এই পদ্ধতির ব্যবহার ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে এবং বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন যে পরিবহন ও কর্মী সুরক্ষার মতো অন্যান্য খাতেও এর পরিধি প্রসারিত হতে পারে।
সুইস রে-এর (Swiss Re) ইউকে এবং আয়ারল্যান্ড পাবলিক সেক্টর সলিউশনসের প্রধান এইদান কের মনে করেন, প্যারামেট্রিক বীমা এই ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। তবে শুধু বীমার ওপর নির্ভর না করে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজেদের কার্যক্রমে দীর্ঘমেয়াদী পরিবর্তন আনতে হবে। কুলিং প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করা, কর্মক্ষেত্র নতুন করে সাজানো এবং সাপ্লাই চেইন বা সরবরাহ শৃঙ্খলকে আরও শক্তিশালী করার মাধ্যমে চরম তাপপ্রবাহ মোকাবেলায় প্রস্তুত থাকতে হবে বলে মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
