বীমা খাতে অনিয়ম রুখতে জোরালো তদারকি প্রয়োজন

বাংলাদেশের বীমা খাতে অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি ও নিয়ন্ত্রক ব্যর্থতার অভিযোগ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী খাতটির বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। বিশেষ করে পলিসিধারীদের বৈধ দাবি দীর্ঘদিনেও নিষ্পত্তি না হওয়া এবং বীমা কোম্পানিগুলোর কার্যক্রমে স্বচ্ছতার ঘাটতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

বীমা খাতের সংকটকে ব্যাংক খাতের সমস্যার সঙ্গে তুলনা করেছেন অর্থমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে, অল্প কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ছাড়া অনেক বীমা কোম্পানির ব্যবসায়িক কার্যক্রম নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে। পলিসির শর্ত অনুযায়ী গ্রাহকের বৈধ দাবি পরিশোধের ক্ষেত্রে নানা অজুহাত দেখানো হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। প্রকাশিত তথ্যে বলা হয়েছে, বীমা খাতে এখনো ৫৭ শতাংশ পর্যন্ত দাবি নিষ্পত্তি হয়নি।

একজন পলিসিধারী নিয়মিত প্রিমিয়াম পরিশোধ করেন নির্দিষ্ট আর্থিক সুরক্ষা পাওয়ার প্রত্যাশায়। পলিসির শর্ত পূরণ হওয়ার পরও যদি দাবি নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা দেখা দেয়, তাহলে তা গ্রাহকের আর্থিক পরিকল্পনায় চাপ তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে এমন পরিস্থিতি বীমা ব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থাকেও দুর্বল করে।

বীমা কোম্পানিগুলোকে নির্ধারিত আইন ও বিধিবিধান মেনে ব্যবসা পরিচালনা করতে হয়। কোনো প্রতিষ্ঠান নিয়ম লঙ্ঘন করলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রয়েছে। বাংলাদেশে এ খাতের নিয়ন্ত্রণ ও তদারকির জন্য বীমা আইন ২০১০ এবং বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ আইন ২০১০ কার্যকর রয়েছে। বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) ওপর কোম্পানিগুলোর কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্বও রয়েছে।

তবে বিদ্যমান আইন থাকলেও তার কার্যকর প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। অর্থমন্ত্রী বীমা খাতের জন্য ব্যাংক খাতের রেজল্যুশন ব্যবস্থার আদলে একটি ‘ইনস্যুরেন্স রেজল্যুশন অ্যাক্ট’ প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। নতুন আইন কিছু ক্ষেত্রে অতিরিক্ত আইনি কাঠামো দিতে পারে। কিন্তু শুধু নতুন আইন প্রণয়ন করলেই অনিয়ম বন্ধ হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। বরং বিদ্যমান আইনগুলো যথাযথভাবে প্রয়োগ এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার সক্ষমতা বাড়ানোও জরুরি।

বীমা কোম্পানিগুলোর অর্থ ব্যবস্থাপনার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। কোনো প্রতিষ্ঠান গ্রাহকদের বৈধ দাবি পরিশোধে বিলম্ব করার সময় জমি বা অন্যান্য সম্পদ কেনায় অর্থ ব্যয় করলে তার আর্থিক অগ্রাধিকার নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। একইভাবে সরকারি সিকিউরিটিজসহ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কোম্পানির গ্রাহকদের প্রতি বিদ্যমান দায় এবং অর্থ পরিশোধের সক্ষমতাও বিবেচনায় থাকা প্রয়োজন।

বীমা খাতে দুই ধরনের সার্ভার বা পৃথক রেকর্ড ব্যবহারের অভিযোগ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। একটি সার্ভারে প্রকৃত তথ্য এবং অন্যটিতে ভিন্ন তথ্য রাখার মতো ব্যবস্থা থাকলে নিয়ন্ত্রক সংস্থার পক্ষে কোনো কোম্পানির প্রকৃত আর্থিক অবস্থা ও লেনদেন যাচাই করা কঠিন হতে পারে। তথ্যের এমন অসঙ্গতি অনিয়ম আড়াল করার সুযোগ তৈরি করতে পারে।

এই ধরনের চর্চা বন্ধে একটি সময়সীমা নির্ধারণের কথা জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। সময়সীমা শেষ হওয়ার পর বীমা কোম্পানিগুলোতে পরিদর্শন পরিচালনার কথাও বলা হয়েছে। তবে পরিদর্শন কার্যক্রম কতটা ফলপ্রসূ হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে আইডিআরের জনবল ও সক্ষমতা নিয়ে। বিপুলসংখ্যক প্রতিষ্ঠানের হিসাব, লেনদেন ও নথিপত্র যথাযথভাবে পরীক্ষা করতে পর্যাপ্ত জনবল এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতা প্রয়োজন।

পরিদর্শনকারীদের সততা ও পেশাগত দায়িত্বশীলতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। মাঠপর্যায়ের তদারকিতে অনিয়মের সুযোগ থাকলে কোনো উদ্যোগই কাঙ্ক্ষিত ফল দিতে পারবে না। এ কারণে পরিদর্শন কার্যক্রমকে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিয়মিত নজরদারির মধ্যে রাখা এবং প্রতিবেদনের ভিত্তিতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

এ ক্ষেত্রে ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি ব্যবস্থা কার্যকর হতে পারে। সব বীমা কোম্পানিকে একই মাত্রায় পর্যবেক্ষণের পরিবর্তে যেসব প্রতিষ্ঠানে বেশি সংখ্যক দাবি অনিষ্পন্ন, আর্থিক ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা বা লেনদেনে অস্বাভাবিকতার ঝুঁকি রয়েছে, সেগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া যেতে পারে। এতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার সীমিত জনবল ও সম্পদ আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হবে।

ডিজিটাল ব্যবস্থাপনার বিস্তারও বীমা খাতে স্বচ্ছতা বাড়াতে সহায়ক হতে পারে। প্রিমিয়াম জমা, কিস্তি পরিশোধ, পলিসির মেয়াদপূর্তির অর্থ এবং দাবি নিষ্পত্তির তথ্য নিয়মিত অনলাইনে হালনাগাদ করা হলে কাগজভিত্তিক নথির ওপর নির্ভরতা কমবে। একই সঙ্গে লেনদেনের তথ্য পরিবর্তন বা গোপন করার সুযোগও সীমিত হতে পারে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা নিয়মিত এসব তথ্য পর্যবেক্ষণ করতে পারলে অস্বাভাবিকতা দ্রুত শনাক্ত করা সহজ হবে।

পলিসিধারীদের বকেয়া দাবি পরিশোধের বিষয়টিও এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অর্থমন্ত্রী প্রয়োজন হলে বীমা কোম্পানির সম্পদ বা সম্পত্তি বিক্রি করে গ্রাহকদের পাওনা পরিশোধের কথা বলেছেন। এমন ব্যবস্থা নেওয়া হলে তা অবশ্যই স্বচ্ছ প্রক্রিয়া এবং প্রচলিত আইন ও বিধিবিধানের আওতায় করতে হবে, যাতে গ্রাহকদের স্বার্থ যথাযথভাবে সুরক্ষিত থাকে।

বীমা খাতের বর্তমান সংকট সমাধানে তাই শুধু নতুন আইন প্রণয়ন যথেষ্ট নয়। বিদ্যমান আইনের কার্যকর প্রয়োগ, আইডিআরের সক্ষমতা বৃদ্ধি, নিয়মিত পরিদর্শন, ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি, ডিজিটাল তথ্য ব্যবস্থাপনা এবং বৈধ দাবি দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা একসঙ্গে কার্যকর করা প্রয়োজন।

গ্রাহকের আস্থা ফিরিয়ে আনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো পলিসির প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সময়মতো পাওনা পরিশোধ করা। নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও বীমা কোম্পানিগুলোর মধ্যে জবাবদিহি এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা গেলে দেশের বীমা খাত আরও সুশৃঙ্খলভাবে এগিয়ে যেতে পারে। দীর্ঘদিনের অনিয়ম কাটিয়ে একটি নির্ভরযোগ্য বীমা ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য এখন কার্যকর পদক্ষেপই সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।

মন্তব্য করুন