রোগ গোপনের প্রমাণ না মেলায় বিধবাকে বিমার অর্থ দেওয়ার নির্দেশ

ভারতে বিমা নেওয়ার আগে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও কিডনির রোগের তথ্য গোপনের অভিযোগ তুলে এক ব্যক্তির জীবনবিমার দাবি প্রত্যাখ্যান করেছিল সংশ্লিষ্ট বিমা সংস্থা। তবে অভিযোগের সমর্থনে নির্ভরযোগ্য চিকিৎসা-নথি উপস্থাপন করতে না পারায় সংস্থাটির সিদ্ধান্ত বহাল থাকেনি। শেষ পর্যন্ত মৃত ব্যক্তির স্ত্রী মমতা গুপ্তাকে ১৪ লাখ ৭৩ হাজার রুপি বিমার অর্থ দেওয়ার নির্দেশ বহাল রেখেছেন পাঞ্জাব রাজ্য ভোক্তা কমিশন। একই সঙ্গে বকেয়া অর্থের ওপর বার্ষিক ৬ শতাংশ সুদ, ১০ হাজার রুপি ক্ষতিপূরণ এবং মামলার খরচ বাবদ ৫ হাজার রুপি দেওয়ার নির্দেশও বহাল রাখা হয়েছে।
১৪ অক্টোবর প্রকাশিত দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, অরুণ গুপ্তের মৃত্যুর পর তাঁর স্ত্রী মমতা গুপ্তা জীবনবিমার অর্থ দাবি করেন। কিন্তু বিমা সংস্থাটি দাবি প্রত্যাখ্যান করে জানায়, পলিসি নেওয়ার আগে অরুণ তাঁর শারীরিক অসুস্থতার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশ করেননি। এ নিয়ে শুরু হওয়া বিরোধ শেষ পর্যন্ত ভোক্তা কমিশন পর্যন্ত গড়ায়।
অরুণ গুপ্ত ২০১৯ সালের ৩১ জুলাই একটি গ্রুপ ক্রেডিট লাইফ ইনস্যুরেন্স পলিসি গ্রহণ করেছিলেন। এর বিপরীতে তিনি ২৩ হাজার ৭৬৫ রুপি প্রিমিয়াম পরিশোধ করেন। পলিসিটির মেয়াদ ছিল ২০২২ সালের ৩০ জুলাই পর্যন্ত। কিন্তু মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই, ২০২১ সালের ২৪ জানুয়ারি হৃদ্‌যন্ত্র ও ফুসফুসের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং শারীরিক শকের কারণে তাঁর মৃত্যু হয়। পলিসিতে মনোনীত সুবিধাভোগী হিসেবে তাঁর স্ত্রী মমতা গুপ্তার বিমার অর্থ পাওয়ার কথা ছিল।
২০২১ সালের ২৮ এপ্রিল বিমা সংস্থাটি তাঁর দাবি প্রত্যাখ্যান করে। সংস্থাটির বক্তব্য ছিল, বিমার আবেদনপত্রে অরুণ নিজের পূর্ববর্তী শারীরিক অসুস্থতা সম্পর্কে নেতিবাচক উত্তর দিয়েছিলেন। অথচ সংস্থার দাবি অনুযায়ী, তদন্তে উঠে আসে যে ২০১৭ সালের জুনে তিনি চণ্ডীগড়ের পোস্টগ্র্যাজুয়েট ইনস্টিটিউট অব মেডিক্যাল এডুকেশন অ্যান্ড রিসার্চে (পিজিআইএমইআর) দীর্ঘমেয়াদি কিডনির রোগের চিকিৎসার জন্য ভর্তি হয়েছিলেন। এ ছাড়া তাঁর ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ থাকার কথাও দাবি করে বিমা সংস্থাটি।
তবে অভিযোগের সমর্থনে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা-প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেনি সংস্থাটি। তদন্তকারীর প্রতিবেদনে পূর্ববর্তী চিকিৎসার যে তথ্য উল্লেখ করা হয়েছিল, তার পক্ষে হাসপাতালের নথি, চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন, রোগ নির্ণয়ের প্রতিবেদন কিংবা অন্য কোনো নির্ভরযোগ্য চিকিৎসা-দলিল কমিশনের সামনে হাজির করা হয়নি। ফলে বিমা পলিসি গ্রহণের আগেই অরুণ ওই রোগগুলোতে আক্রান্ত ছিলেন কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত হওয়ার মতো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
একইভাবে, অরুণ জেনেশুনে নিজের শারীরিক অসুস্থতার তথ্য গোপন করেছিলেন—এমন দাবির পক্ষেও পর্যাপ্ত প্রমাণ ছিল না। কমিশনের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, শুধু তদন্তকারীর বক্তব্যের ওপর নির্ভর করে কোনো ব্যক্তির পূর্ববর্তী চিকিৎসার ইতিহাস কিংবা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপনের অভিযোগকে প্রতিষ্ঠিত বলে ধরে নেওয়া যায় না।
বিমা দাবি নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে রোগের অস্তিত্ব এবং সেই রোগ সম্পর্কে বিমাগ্রহীতার জ্ঞান—দুটি বিষয়ই গুরুত্বপূর্ণ। পলিসি গ্রহণের পর তৈরি হওয়া চিকিৎসার নথিতে কোনো রোগের উল্লেখ থাকলেই প্রমাণিত হয় না যে বিমা নেওয়ার আগেও রোগটি ছিল। একইভাবে, কোনো ব্যক্তি আগে থেকেই রোগে আক্রান্ত থাকলেও তিনি সেটি সম্পর্কে জানতেন কি না, তা যাচাই না করে ইচ্ছাকৃত তথ্য গোপনের সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।
কমিশন আরও পর্যবেক্ষণ করেছে, ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপ থাকার অভিযোগ একাই জীবনবিমার দাবি বাতিলের যথেষ্ট ভিত্তি হতে পারে না। এসব রোগের সঙ্গে হৃদ্‌রোগ কিংবা কিডনির জটিলতার সম্পর্ক থাকতে পারে, কিন্তু নির্দিষ্ট চিকিৎসা-প্রমাণ ছাড়া কারও মৃত্যুর কারণ বা বিমা দাবি প্রত্যাখ্যানের যৌক্তিকতা সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে কমিশন পূর্ববর্তী ভোক্তা আদালতের সিদ্ধান্ত এবং ভারতের সুপ্রিম কোর্টের একটি রায়ের বিষয়ও বিবেচনায় নিয়েছে।
এর আগে ২০২৩ সালের ১৭ জুলাই জলন্ধরের জেলা ভোক্তা কমিশন মমতা গুপ্তার পক্ষে রায় দিয়েছিলেন। ওই রায়ে বিমা সংস্থাটিকে ১৪ লাখ ৭৩ হাজার রুপি পরিশোধের নির্দেশ দেওয়া হয়। পাশাপাশি, দাবির তারিখ থেকে অর্থ পরিশোধ না হওয়া পর্যন্ত বার্ষিক ৬ শতাংশ হারে সুদ, ক্ষতিপূরণ বাবদ ১০ হাজার রুপি এবং মামলার খরচ হিসেবে ৫ হাজার রুপি দেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়েছিল।
জেলা কমিশনের ওই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে পাঞ্জাব রাজ্য ভোক্তা কমিশনে আপিল করে বিমা সংস্থাটি। তবে আপিলেও নিজেদের অভিযোগের পক্ষে যথেষ্ট প্রমাণ তুলে ধরতে না পারায় জেলা কমিশনের নির্দেশ বহাল থাকে। ফলে মমতা গুপ্তার বিমার অর্থ পাওয়ার অধিকার অক্ষুণ্ন থাকে।
মামলায় প্রিমিয়ামের অর্থ ফেরত দেওয়ার বিষয়টিও উঠে এসেছে। বিমা সংস্থাটি আগে ২৩ হাজার ৭৬৫ রুপি ফেরত দিয়েছিল এবং সেটিকে চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করেছিল। জেলা কমিশনের নির্দেশ অনুযায়ী, মমতা গুপ্তা ওই অর্থ পেয়ে থাকলে তাঁকে তা ফেরত দিতে হবে। অন্যদিকে, আপিলের সময় সংস্থার জমা দেওয়া ৮ লাখ ৬৪ হাজার রুপি এবং ওই অর্থের ওপর অর্জিত সুদও আইন অনুযায়ী তাঁকে দেওয়ার নির্দেশ রয়েছে।
এই সিদ্ধান্ত জীবনবিমার গ্রাহক ও তাঁদের পরিবারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। বিমা পলিসি গ্রহণের সময় আবেদনপত্রে স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য সঠিকভাবে দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। একই সঙ্গে, কোনো দাবি প্রত্যাখ্যানের ক্ষেত্রে বিমা সংস্থাকেও অভিযোগের পক্ষে গ্রহণযোগ্য প্রমাণ উপস্থাপন করতে হয়। বিশেষ করে, পূর্ববর্তী রোগের তথ্য গোপনের অভিযোগ উঠলে রোগটি পলিসি গ্রহণের আগে থেকেই ছিল কি না এবং বিমাগ্রহীতা সেটি সম্পর্কে অবগত ছিলেন কি না, তা নির্ভরযোগ্য নথির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন।
মমতা গুপ্তার মামলায় কমিশনের সিদ্ধান্ত দেখিয়েছে, কেবল সন্দেহ কিংবা তদন্তকারীর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা তথ্যের ভিত্তিতে বিমার অর্থ আটকে রাখা যায় না। যথাযথ প্রমাণ ছাড়া দাবি প্রত্যাখ্যান করা হলে ভোক্তা কমিশনে প্রতিকার চাওয়ার সুযোগ রয়েছে। জীবনবিমার উদ্দেশ্যই হলো বিমাগ্রহীতার মৃত্যুর পর তাঁর পরিবারের আর্থিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা। তাই দাবি নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে বিমা সংস্থার শর্ত মানার পাশাপাশি গ্রাহকের অধিকার রক্ষাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

মন্তব্য করুন