বিমা ঝুঁকি স্থানান্তরে সিঙ্গাপুরের নতুন হাতিয়ার ‘পিসিসি’ কাঠামো

বৈশ্বিক অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি সিঙ্গাপুর তাদের বিমা খাতকে আরও আধুনিক ও যুগোপযোগী করতে এক বড় ধরনের সংস্কারের পথে হাঁটছে। দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং আর্থিক খাতের প্রধান নিয়ন্ত্রক সংস্থা ‘মনিটারি অথরিটি অব সিঙ্গাপুর’ (এমএএস) পুঁজি বাজারে ঝুঁকি স্থানান্তরের প্রক্রিয়াকে আরও ত্বরান্বিত করতে একটি নতুন ধরনের করপোরেট কাঠামো চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ‘প্রটেক্টেড সেল কোম্পানি’ বা পিসিসি নামের এই বিশেষ কাঠামোটির মূল লক্ষ্য হলো অলটারনেটিভ বা বিকল্প উপায়ে বিমা ঝুঁকি স্থানান্তরের সমাধানগুলোকে বৈশ্বিক বাজারে আরও সহজলভ্য করা।

সিঙ্গাপুরের উপ-প্রধানমন্ত্রী এবং বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী গান কিম ইয়ং গত ২৫ জুন ‘অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস ইন সিঙ্গাপুর’-এর বার্ষিক নৈশভোজে এই নতুন উদ্যোগের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন। বর্তমানে এমএএস-এর চেয়ারম্যানের দায়িত্বে থাকা এই শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, পিসিসি কাঠামোটি মূলত একটি মূল বা ‘কোর’ প্রতিষ্ঠানের অধীনে আলাদা আলাদা ছোট বা স্বতন্ত্র ‘সেল’ (কোষ) তৈরি করে সম্পদ ও দায়গুলোকে সুনির্দিষ্টভাবে ভাগ (রিং-ফেন্স) করে রাখার আইনি সুবিধা দেয়। এর ফলে পুরো ব্যবস্থার সাধারণ অবকাঠামো ও সুযোগ-সুবিধা একই থাকলেও, বিভিন্ন ধরনের ঝুঁকিগুলোকে সম্পূর্ণ আলাদাভাবে বিন্যাস করা সম্ভব।

নতুন এই করপোরেট কাঠামোর বহুমাত্রিক সুবিধা ব্যাখ্যা করে গান কিম ইয়ং বলেন, “এর চূড়ান্ত ফল হবে অনেক বেশি নমনীয়তা, কম পরিচালন খরচ এবং অত্যন্ত সাশ্রয়ী ও কার্যকর উপায়ে বিমা ঝুঁকি স্থানান্তর।” তিনি আরও জানান যে, এই প্রস্তাবিত কাঠামোটি সাধারণ করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ‘ক্যাপটিভ ইন্স্যুরেন্স’ বা নিজস্ব বিমা ব্যবস্থাপনার পথকে অনেক সহজ করবে। একই সঙ্গে ‘ইন্স্যুরেন্স-লিংকড সিকিউরিটিজ’ (আইএলএস) বা বিমা-সংশ্লিষ্ট সিকিউরিটিজের স্পন্সরদের জন্য পুঁজি বাজারে দ্রুত ও স্বল্প খরচে বড় বড় ঝুঁকি স্থানান্তর করার সুযোগ তৈরি করবে।

জানা গেছে, আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে এই পিসিসি কাঠামোর আইনি ও ব্যবহারিক দিকগুলো নিয়ে একটি পাবলিক কনসালটেশন বা গণ-পরামর্শ শুরু করবে এমএএস, যেখানে এই খাতের বৈশ্বিক ও স্থানীয় অংশীজনদের মতামত ও প্রস্তাবনা নেওয়া হবে।

সিঙ্গাপুরের এই সময়োপযোগী উদ্যোগটি এমন এক প্রেক্ষাপটে এল যখন সামগ্রিকভাবে পুরো এশিয়া অঞ্চল জুড়েই বিমার পরিধি বা কাভারেজ প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত কম। এশিয়ার উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোতে বিপুল পরিমাণ সম্পদ এখনও প্রথাগত বিমার আওতার বাইরে রয়ে গেছে। এই পরিস্থিতিতে ঐতিহ্যগত বিমা ও পুনর্বিমা (রিয়েন্সুরেন্স) ক্ষমতার প্রয়োজনীয়তা যেমন রয়েছে, তেমনি বিকল্প ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কাঠামোর চাহিদাও দিন দিন বাড়ছে। গান কিম ইয়ং মনে করেন, যে আর্থিক কেন্দ্রগুলো ঝুঁকি মূল্যায়নের দক্ষতা, পুনর্বিমা ক্ষমতা, বিকল্প পুঁজি এবং নমনীয় ঝুঁকি স্থানান্তর কাঠামোকে এক সুতোয় বাঁধতে পারবে, ভবিষ্যতের বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধিতে তারাই নেতৃত্ব দেবে। আর সিঙ্গাপুর এই নতুন পিসিসি কাঠামোর মাধ্যমে সেই শীর্ষস্থানটিই ধরে রাখতে চায়।

মন্তব্য করুন