অবসর ফুরানোর আগেই সঞ্চয় শেষ হওয়ার ঝুঁকিতে ৮০ শতাংশ সিঙ্গাপুরবাসী

ভবিষ্যতের আর্থিক নিরাপত্তা নিয়ে এক চরম অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন সিঙ্গাপুরের মধ্যবয়সী ও তরুণ প্রজন্ম। এশিয়ার অন্যতম শীর্ষস্থানীয় বীমা প্রতিষ্ঠান ম্যানুলাইফের ‘এশিয়া কেয়ার সার্ভে ২০২৬’ শীর্ষক সাম্প্রতিক এক আন্তর্জাতিক সমীক্ষায় অত্যন্ত উদ্বেগজনক এই চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশটির প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ আশঙ্কা করছেন যে তাদের জীবনকাল শেষ হওয়ার আগেই সঞ্চিত সমস্ত অর্থ ফুরিয়ে যেতে পারে। মূলত পরিবারের ভরণপোষণের বাড়তি দায়িত্ব এবং ক্রমবর্ধমান চিকিৎসা ব্যয়ের কারণেই তারা সময়মতো অবসরকালীন পরিকল্পনা বা বীমা সুবিধা নিশ্চিত করতে পারছেন না।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি ও মার্চের মধ্যে এশিয়ার ৯টি দেশের প্রায় ৯ হাজার মানুষের ওপর এই জরিপ চালানো হয়। এর মধ্যে সিঙ্গাপুরের ১,০৭৪ জন উত্তরদাতা অংশ নেন।

পারিবারিক দায়বদ্ধতার চাপে পিষ্ট তরুণ প্রজন্ম

সমীক্ষার তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সিঙ্গাপুরের প্রায় ৪৬ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকের ওপর পরিবারের আর্থিক দায়িত্ব রয়েছে। এই উত্তরদাতাদের মধ্যে ৬২ শতাংশ সরাসরি স্বীকার করেছেন যে, বর্তমানের এই পারিবারিক প্রতিশ্রুতির কারণে তারা ভবিষ্যতের জন্য পর্যাপ্ত সঞ্চয় করতে পারছেন না।

সবচেয়ে আশঙ্কাজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে দেশটির তরুণ প্রজন্মের মধ্যে। ১৮ থেকে ২৪ বছর বয়সীদের ৮১ শতাংশ এবং ২৫ থেকে ৩৪ বছর বয়সীদের ৭৫ শতাংশ জানিয়েছেন, পারিবারিক বাধ্যবাধকতার কারণে তাদের দীর্ঘমেয়াদী আর্থিক পরিকল্পনা পিছিয়ে যাচ্ছে। ৩৫ বছরের কম বয়সী এই যুবসমাজ তাদের মাসিক আয়ের গড়ে প্রায় ৪০ শতাংশ অর্থই পরিবারের সদস্যদের পেছনে ব্যয় করতে বাধ্য হচ্ছেন, যা তাদের ব্যক্তিগত সঞ্চয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

স্বনির্ভরতার আকাঙ্ক্ষা বনাম বাস্তবতার কঠিন রূপ

তীব্র আর্থিক টানাপোড়েন এবং মানসিক চাপ থাকা সত্ত্বেও সিঙ্গাপুরের নাগরিকদের মধ্যে আত্মনির্ভরশীল থাকার প্রবল ইচ্ছা দেখা গেছে। জরিপে অংশ নেওয়া ৯২ শতাংশ মানুষ জানিয়েছেন, তারা বৃদ্ধ বয়সেও আর্থিক স্বাধীনতা বজায় রাখতে চান এবং কোনোভাবেই পরিবারের অন্য সদস্যদের ওপর নির্ভরশীল হতে চান না। এর পাশাপাশি, ৬১ শতাংশ নাগরিক মনে করেন একটি দীর্ঘ ও স্বাধীন জীবনের মূল সার্থকতা হলো অন্য কারও ওপর ‘বোঝা’ হয়ে না থাকা।

তবে এই মানসিকতার বিপরীতে বাস্তব পরিস্থিতি বেশ কঠিন। চিকিৎসা খাতের ব্যয় এবং অবসরকালীন আয় নিয়ে সিঙ্গাপুরবাসীদের উদ্বেগ দিন দিন বাড়ছে। প্রায় ৭৮ শতাংশ মানুষ মনে করেন দীর্ঘায়ু পেলেও একপর্যায়ে তাদের সঞ্চয় শেষ হয়ে যাবে। অন্যদিকে, ভবিষ্যতে প্রয়োজনীয় সেবা ও চিকিৎসার খরচ মেটাতে পারবেন কি না—তা নিয়ে চিন্তিত ৭০ শতাংশ নাগরিক, যা এই অঞ্চলের গড় হারের (৬৬%) চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।

বিনিয়োগে বৈচিত্র্য ও বিকল্প আয়ের খোঁজ

ভবিষ্যতে স্বনির্ভর থাকার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা হিসেবে দুটি বিষয়কে চিহ্নিত করেছেন দেশটির নাগরিকেরা। ৫৫ শতাংশ মানুষ মনে করেন পর্যাপ্ত সঞ্চয় ও বিনিয়োগের অভাবই এর মূল কারণ। আর ৪২ শতাংশের মতে, অবসরের পর আয়ের কোনো স্থায়ী উৎস না থাকাটাই সবচেয়ে বড় অন্তরায়।

এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় এখনো সিংহভাগ মানুষ (৭৮%) প্রথাগত ব্যক্তিগত সঞ্চয়ের ওপরই ভরসা রাখছেন। তবে আশার কথা হলো, দেশটির নাগরিকেরা এখন বিকল্প আর্থিক কৌশলের দিকে ঝুঁকছেন। প্রায় ৪৩ শতাংশ উত্তরদাতা বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ ছড়িয়ে দেওয়ার (ডাইভারসিফিকেশন) পরিকল্পনা করছেন এবং ৩৪ শতাংশ মানুষ এমন বিনিয়োগের কথা ভাবছেন যা থেকে নিয়মিত লভ্যাংশ বা আয় আসবে।

স্বাস্থ্য সচেতনতায় বড় ধরনের ঘাটতি

আর্থিক ভাবনার পাশাপাশি স্বাস্থ্য খাতের পরিকল্পনাতেও সিঙ্গাপুরবাসীদের বড় ধরনের ঘাটতি দেখা গেছে, যা ভবিষ্যতে বীমা এবং চিকিৎসা ব্যয়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। জরিপে অংশ নেওয়া ৮৭ শতাংশ মানুষ নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার গুরুত্ব স্বীকার করেছেন এবং ৮৮ শতাংশ মনে করেন প্রতিরোধমূলক যত্ন দীর্ঘস্থায়ী রোগের ঝুঁকি কমায়।

অথচ এই সচেতনতা কেবল মুখে মুখেই সীমাবদ্ধ। বাস্তবে মাত্র ৫০ শতাংশ মানুষ প্রতি বছর নিয়মিত ও পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্য পরীক্ষা করান। এমনকি ১১ শতাংশ নাগরিক জানিয়েছেন যে তারা জীবনে কখনো কোনো ধরনের স্বাস্থ্য পরীক্ষাই করাননি।

উন্নত জীবনযাত্রার দেশ হওয়া সত্ত্বেও সিঙ্গাপুরে পারিবারিক দায়িত্ব এবং ভবিষ্যৎ সুরক্ষার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা সাধারণ মানুষের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সময়মতো সঠিক আর্থিক পরিকল্পনা এবং স্বাস্থ্য সুরক্ষায় বিনিয়োগ না করলে ভবিষ্যতে এই সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকট আরও ঘনীভূত হতে পারে।

জরিপের মূল পরিসংখ্যান একনজরে

নিচে ম্যানুলাইফ এশিয়া কেয়ার সার্ভে ২০২৬-এর গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও উপাত্তগুলো তুলে ধরা হলো:

ক্রমিকজরিপের সূচক ও নাগরিক প্রতিক্রিয়াশতকরা হার (%)
১জীবনকাল শেষ হওয়ার আগেই সঞ্চয় ফুরিয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় ভোগা নাগরিক৮০%
২বৃদ্ধ বয়সেও সম্পূর্ণ আর্থিক স্বাধীনতা বজায় রাখতে ইচ্ছুক ব্যক্তি৯২%
৩প্রতিরোধমূলক যত্ন দীর্ঘস্থায়ী রোগের ঝুঁকি কমায় বলে বিশ্বাসী নাগরিক৮৮%
৪নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার গুরুত্ব স্বীকার করা উত্তরদাতা৮৭%
৫১৮ থেকে ২৪ বছর বয়সী তরুণ, যাদের পারিবারিক চাপে আর্থিক পরিকল্পনা পিছিয়ে যাচ্ছে৮১%
৬দীর্ঘায়ু পেলেও একপর্যায়ে জমানো টাকা শেষ হয়ে যাবে বলে মনে করেন যারা৭৮%
৭অবসরকালীন সুরক্ষায় এখনো সাধারণ ব্যক্তিগত সঞ্চয়ের ওপর নির্ভরশীল মানুষ৭৮%
৮২৫ থেকে ৩৪ বছর বয়সী তরুণ, যাদের আর্থিক পরিকল্পনা পারিবারিক কারণে বাধাগ্রস্ত৭৫%
৯ভবিষ্যতে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা খরচ মেটাতে পারবেন কি না তা নিয়ে চিন্তিত নাগরিক৭০%
১০পরিবারের ওপর ‘বোঝা’ না হওয়াকে দীর্ঘ জীবনের মূল সার্থকতা মনে করেন যারা৬১%
১১পর্যাপ্ত সঞ্চয় ও বিনিয়োগের অভাবকে স্বনির্ভরতার প্রধান বাধা মনে করেন যারা৫৫%
১২প্রতি বছর নিয়মিত ও পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো সচেতন নাগরিক৫০%
১৩প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিক, যাদের ওপর সরাসরি পরিবারের আর্থিক দায়িত্ব রয়েছে৪৬%
১৪বিনিয়োগে বৈচিত্র্য এনে ঝুঁকি কমানোর পরিকল্পনা করছেন এমন ব্যক্তি৪৩%
১৫অবসরের পর আয়ের কোনো স্থায়ী উৎস না থাকাকে বড় অন্তরায় মনে করেন যারা৪২%
১৬এমন খাতে বিনিয়োগ করতে ইচ্ছুক যা থেকে নিয়মিত লভ্যাংশ বা আয় আসবে৩৪%
১৭জীবনের কোনো পর্যায়েই কখনো কোনো ধরনের স্বাস্থ্য পরীক্ষা না করানো মানুষ১১%

মন্তব্য করুন