ভারতে গৃহঋণ বা হোম লোনের বিপরীতে বীমা সুরক্ষার (হোম লোন কাভার) চাহিদা আকাশচুম্বী হয়ে উঠেছে। গত পাঁচ মাসে এই বীমা নীতি গ্রহণের হার প্রায় সাত গুণ বেড়েছে। ঋণদাতাদের ওপর নির্ভর না করে নিজেদের দীর্ঘমেয়াদী আর্থিক ঝুঁকি স্বাধীনভাবে সুরক্ষিত করার তাগিদ থেকেই ঋণগ্রহীতারা এই সিদ্ধান্তের দিকে ঝুঁকছেন। দেশের শীর্ষস্থানীয় বীমা বাজার প্ল্যাটফর্ম ‘পলিসিবাজার’-এর সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে।
Table of Contents
মেট্রো শহরগুলোর আধিপত্য ও মফস্বলের উত্থান
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারতের বড় মেট্রো শহরগুলো থেকেই বর্তমানে মোট হোম লোন বীমা পলিসির ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশ কেনা হচ্ছে। এই তালিকায় সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে দিল্লি এনসিআর (জাতীয় রাজধানী অঞ্চল), যেখানকার অবদান প্রায় ৮ থেকে ১০ শতাংশ। এর ঠিক পরেই রয়েছে মুম্বাই (৫% থেকে ৭%)। এছাড়া বেঙ্গালুরু, লক্ষ্ণৌ এবং পুনে—প্রতিটি শহর থেকে ৩ থেকে ৫ শতাংশ করে পলিসি কেনা হচ্ছে। মেট্রো শহরগুলো এখন চালকের আসনে থাকলেও, গত দুই মাসে নন-মেট্রো বা মফস্বল অঞ্চলগুলো থেকেও হোম লোন বীমার চাহিদা বেশ দ্রুত গতিতে বাড়তে শুরু করেছে।
তরুণ ও চাকরিজীবী শ্রেণিতেই আগ্রহ বেশি
পরিসংখ্যান বলছে, কর্মজীবী তরুণ এবং মধ্যবয়সী জনগোষ্ঠীই এই বীমা কাভার নেওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে এগিয়ে আছেন। ৩১ থেকে ৪৫ বছর বয়সী ঋণগ্রহীতারা একাই মোট ক্রেতাদের প্রায় ৭০ শতাংশ। এর মধ্যে ৩১ থেকে ৩৫ বছর বয়সীরা ২২ শতাংশ, ৩৬ থেকে ৪০ বছর বয়সীরা ২৬ শতাংশ এবং ৪১ থেকে ৪৫ বছর বয়সীরা প্রায় ২৩ শতাংশ পলিসি কিনছেন।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই বীমা ক্রেতাদের সিংহভাগই (৮০% থেকে ৮৫%) চাকরিজীবী বা বেতনভুক্ত পেশাদার। এছাড়া বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, স্বামী ও স্ত্রী যৌথভাবে আবেদন করে এই বীমাকৃত ঋণ সুবিধা গ্রহণ করছেন।
ঋণের পরিমাণের ওপর সুরক্ষার নির্ভরতা
ভোক্তাদের আচরণ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গৃহঋণের অঙ্ক যত বড় হচ্ছে, বীমা করার প্রবণতাও তত বাড়ছে। ৫০ লাখ থেকে ১ কোটি রুপির ঋণগ্রহীতারা এই বাজারে সবচেয়ে বড় অংশ দখল করে আছেন, যা মোট বীমাকৃত গ্রাহকের ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ। ১ কোটি রুপির বেশি ঋণ নেওয়া গ্রাহকদের অংশ ২০ থেকে ২৫ শতাংশ। অন্যদিকে, ২ কোটি রুপি বা তার বেশি ঋণের ক্ষেত্রে এই হার ৮ থেকে ১০ শতাংশ এবং ৩ কোটি রুপির বেশি বড় অঙ্কের ঋণের ক্ষেত্রে ৪ থেকে ৫ শতাংশ গ্রাহক বীমা সুরক্ষা বেছে নিচ্ছেন। গড়ে বেশিরভাগ গ্রাহক ৫০ লাখ থেকে ৭৫ লাখ রুপির ঋণের বিপরীতে এই কাভার নিচ্ছেন, যার গড় পরিশোধের মেয়াদ ১২ থেকে ১৫ বছর।
অনলাইন কেনাকাটায় বিপুল সাশ্রয়
ক্রেতাদের মানসিকতায় এখন বড় ধরনের পরিবর্তন স্পষ্ট। আগে ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো ঋণ দেওয়ার সময় বাধ্যতামূলকভাবে এই পলিসিগুলো গছিয়ে দিত। কিন্তু এখন ক্রেতারা এগুলোকে নিজেদের সুরক্ষাকবচ হিসেবে স্বাধীনভাবে বিবেচনা করছেন। পলিসিবাজারের লাইফ ইন্স্যুরেন্স বিভাগের চিফ বিজনেস অফিসার বিবেক জৈন জানান, গ্রাহকেরা এখন সাধারণ জীবন বীমা থেকে গৃহঋণের সুরক্ষাকে আলাদা করে দেখতে পছন্দ করছেন।
এছাড়া অফলাইনের চেয়ে অনলাইনে পলিসি কেনার আগ্রহ বাড়ছে প্রধানত খরচের পার্থক্যের কারণে। ২০ বছরের মেয়াদে অফলাইনের তুলনায় অনলাইনে হোম লোন বীমা কেনা প্রায় ৭২ শতাংশ পর্যন্ত সাশ্রয়ী হতে পারে। এর বড় একটি কারণ হলো অনলাইন পলিসিগুলোর ওপর শূন্য শতাংশ জিএসটি (পণ্য ও পরিষেবা কর) সুবিধা।
ভারতের হোম লোন বীমা বাজারের মূল পরিসংখ্যান
পলিসিবাজারের বিশ্লেষণ থেকে পাওয়া বিভিন্ন ডেটা ও পরিসংখ্যান নিচে একটি তালিকার মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো:
| ক্রমিক | সূচক এবং গ্রাহক প্রবণতা | পরিসংখ্যান / শতকরা হার |
| ১ | চাকরিজীবী বা বেতনভুক্ত পেশাদার ক্রেতাদের হার | ৮০% – ৮৫% |
| ২ | মেট্রো শহরগুলো থেকে মোট পলিসি কেনার হার | ৭০% – ৭৫% |
| ৩ | ৩১ থেকে ৪৫ বছর বয়সী ক্রেতাদের সম্মিলিত অংশ | প্রায় ৭০% |
| ৪ | ৫০ লাখ থেকে ১ কোটি রুপির মধ্যবর্তী ঋণগ্রহীতা গ্রাহক | ৪০% – ৪৫% |
| ৫ | ৩৬ থেকে ৪০ বছর বয়সী ক্রেতাদের অংশ | ২৬% |
| ৬ | ১ কোটি রুপির বেশি ঋণ নিয়ে বীমা করা গ্রাহক | ২০% – ২৫% |
| ৭ | ৪১ থেকে ৪৫ বছর বয়সী ক্রেতাদের অংশ | প্রায় ২৩% |
| ৮ | ৩১ থেকে ৩৫ বছর বয়সী তরুণ ক্রেতাদের অংশ | ২২% |
| ৯ | দিল্লি এনসিআর অঞ্চলের ক্রেতাদের অবদান | ৮% – ১০% |
| ১০ | ২ কোটি রুপি বা তার বেশি ঋণ নেওয়া বীমা গ্রাহক | ৮% – ১০% |
| ১১ | মুম্বাই শহরের ক্রেতাদের অবদান | ৫% – ৭% |
| ১২ | ৩ কোটি রুপির বেশি বড় অঙ্কের ঋণ নেওয়া গ্রাহক | ৪% – ৫% |
| ১৩ | বেঙ্গালুরু, লক্ষ্ণৌ ও পুনের (প্রতিটি শহরের) অবদান | ৩% – ৫% |
| ১৪ | অফলাইনের তুলনায় অনলাইনে পলিসি কেনার সম্ভাব্য সাশ্রয় | ৭২% পর্যন্ত |
| ১৫ | গত পাঁচ মাসে হোম লোন বীমা গ্রহণের প্রবৃদ্ধির হার | ৭ গুণ |
| ১৬ | গ্রাহকদের বেছে নেওয়া ঋণের গড় পরিশোধের মেয়াদ | ১২ – ১৫ বছর |
| ১৭ | দেশের গ্রাহকদের গড় বীমাকৃত ঋণের পরিমাণ | ৫০ লাখ – ৭৫ লাখ রুপি |
