জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় চাপে বীমা খাতের ব্যয়

দেশে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম একসঙ্গে বাড়ায় নতুন করে ব্যয়ের চাপ তৈরি হয়েছে বীমা খাতে। মাঠপর্যায়ে পলিসি সংগ্রহ থেকে শুরু করে কোম্পানির নিজস্ব যানবাহন পরিচালনা, কর্মীদের যাতায়াত এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক কাজে জ্বালানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের ওপরও এর প্রভাব পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। একই সময়ে কমিশন বা অন্যান্য নির্ধারিত সুবিধা অপরিবর্তিত থাকায় বীমা এজেন্টদের ওপরও বাড়তি আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে।

সরকার গত সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) মধ্যরাত থেকে দেশের বাজারে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ২০ টাকা করে বাড়িয়েছে। নতুন মূল্য অনুযায়ী, বর্তমানে খুচরা বাজারে প্রতি লিটার ডিজেল ১৩৫ টাকা, অকটেন ১৬৫ টাকা, পেট্রোল ১৬০ টাকা এবং কেরোসিন ১৫৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

এর আগে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে ভোক্তা পর্যায়ে ডিজেলের দাম ছিল লিটারপ্রতি ১০৪ টাকা, কেরোসিন ১১৬ টাকা, পেট্রোল ১২০ টাকা এবং অকটেন ১২৪ টাকা। অর্থাৎ এক বছরেরও কম সময়ের ব্যবধানে অকটেনের দাম ৪১ টাকা বেড়েছে, যা প্রায় ৩৩ শতাংশের বেশি। অন্যান্য জ্বালানি তেলের ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে।

এই মূল্যবৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব পড়ছে বীমা কোম্পানির মাঠপর্যায়ের কার্যক্রমে। এজেন্টদের বড় একটি অংশ মোটরসাইকেল ব্যবহার করে গ্রাহকদের কাছে গিয়ে নতুন পলিসি সংগ্রহ, কিস্তি আদায় এবং অন্যান্য সেবা দিয়ে থাকেন। ফলে জ্বালানির দাম বাড়লে তাদের দৈনন্দিন যাতায়াত ব্যয়ও বেড়ে যায়। কিন্তু কমিশন হার একই থাকায় অতিরিক্ত ব্যয়ের পুরো চাপ তাদের নিজেদের বহন করতে হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি লাইফ বীমা কোম্পানির এক মাঠপর্যায়ের এজেন্ট বলেন, দিনের বড় সময় তাকে মোটরসাইকেল নিয়ে বিভিন্ন গ্রাহকের কাছে যেতে হয়। তেলের দাম বাড়ার পর যাতায়াত ব্যয় অনেক বেড়েছে। কিন্তু কমিশনে কোনো পরিবর্তন না আসায় আগের তুলনায় একই পরিমাণ ব্যবসা সংগ্রহ করতে বেশি অর্থ খরচ করতে হচ্ছে।

আরেকজন বীমা কর্মীর ভাষ্য, শুধু জ্বালানি নয়, বাইরে বের হলে যাতায়াতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য খরচও বেড়েছে। কোম্পানির পক্ষ থেকে যাতায়াত ভাতা বা অন্যান্য সুবিধা না বাড়লে কমিশননির্ভর কর্মীদের জন্য নতুন পলিসি সংগ্রহের কাজ আগের মতো আকর্ষণীয় রাখা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

বীমা কোম্পানির নিজস্ব পরিচালন ব্যয়ের ক্ষেত্রেও একই ধরনের চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) নির্দেশনা অনুযায়ী, কোম্পানির চেয়ারম্যান ও মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা কোম্পানির তহবিল থেকে সর্বোচ্চ ৪০ লাখ টাকা মূল্যের একটি করে গাড়ি ব্যবহার করতে পারেন। পাশাপাশি কোম্পানির পরিবহন পুলে সর্বোচ্চ চারটি গাড়ি রাখার সুযোগ রয়েছে, প্রতিটির সর্বোচ্চ মূল্য ২৫ লাখ টাকা। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জন্যও নির্দিষ্ট যানবাহন ব্যবহারের ব্যবস্থা রয়েছে।

ফলে গাড়ির সংখ্যা যত বেশি, জ্বালানি ও রক্ষণাবেক্ষণসহ সংশ্লিষ্ট পরিচালন ব্যয়ের চাপও তত বেশি। লাইফ ও নন-লাইফ খাতের কয়েকটি শীর্ষস্থানীয় কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা গেছে, একটি লাইফ বীমা কোম্পানিরই প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাস ও মোটরসাইকেল মিলিয়ে ২৬৮টি যানবাহন রয়েছে।

আইডিআরএর ২০১৮ সালের তথ্য অনুযায়ী, সে সময় দেশের ২৮টি লাইফ বীমা কোম্পানির কাছে মোট ১ হাজার ৮৪১টি গাড়ি এবং ৪৬টি নন-লাইফ বীমা কোম্পানির কাছে ১ হাজার ১২৮টি গাড়ি ছিল। এসব নিজস্ব যানবাহনের জ্বালানি ব্যয় এবং কর্মীদের ট্রাভেল ও কনভেয়েন্স বাবদ ব্যয় কোম্পানির ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়।

সাম্প্রতিক আর্থিক প্রতিবেদনগুলোর তথ্যেও বীমা খাতে জ্বালানি ব্যয়ের আকার স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ২৩টি লাইফ ও নন-লাইফ বীমা কোম্পানির তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২০২৫ সালে ১১টি লাইফ বীমা কোম্পানি জ্বালানি তেল কিনতে মোট ১২ কোটি ৩৬ লাখ ৩১ হাজার ৮৭১ টাকা ব্যয় করেছে। একই সময়ে ১২টি নন-লাইফ বীমা কোম্পানির জ্বালানি তেল বাবদ ব্যয় ছিল ৩ কোটি ৬ লাখ ৫৩ হাজার ৫৫৪ টাকা।

তেলের দাম গড়ে ৩৩ শতাংশ বাড়ায় একই ধরনের ব্যবহার অব্যাহত থাকলে ২০২৬ সালে ওই ১১টি লাইফ বীমা কোম্পানির জ্বালানি ব্যয় আনুমানিক ১৬ কোটি ৩১ লাখ ৯৪ হাজার ৭০ টাকায় পৌঁছাতে পারে। অর্থাৎ আগের হিসাবের তুলনায় বাড়তি ব্যয় হবে প্রায় ৩ কোটি ৯৫ লাখ ৬২ হাজার ১৯৯ টাকা। নন-লাইফ বীমা কোম্পানিগুলোর ক্ষেত্রেও জ্বালানি ব্যয় একই হারে বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এখানেই বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে বীমা কোম্পানিগুলোর ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের আইনগত সীমা। বীমা আইন, ২০১০ অনুযায়ী নির্ধারিত সীমার বেশি ব্যবস্থাপনা ব্যয় করা অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয় এবং এ ধরনের অতিরিক্ত ব্যয়ের জন্য জরিমানার বিধান রয়েছে। লাইফ ও নন-লাইফ—দুই খাতের জন্য ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণে পৃথক বিধিমালাও রয়েছে। এর মধ্যে নন-লাইফ ইন্স্যুরেন্স ব্যবসায় ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণী বিধিমালা-২০১৮ এবং লাইফ ইন্স্যুরেন্স ব্যবসায় ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণী বিধিমালা-২০২০ উল্লেখযোগ্য।

তবে জ্বালানি তেলের সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধির ফলে কোম্পানিগুলোর ব্যবস্থাপনা ব্যয় বেড়ে গেলে সেই অতিরিক্ত চাপ কীভাবে বিবেচনা করা হবে, সে বিষয়ে এখন পর্যন্ত আইডিআরের পক্ষ থেকে নির্দিষ্ট কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি।

বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স ফোরামের (বিআইএফ) জয়েন্ট সেক্রেটারি জেনারেল এস এম নুরুজ্জামান বলেন, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব বীমা কোম্পানিগুলোর পরিচালন ও ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের ওপর পড়বে। বিশেষ করে কোম্পানির নিজস্ব গাড়ির জ্বালানি খরচ এবং কর্মীদের যাতায়াত ভাতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে।

তার মতে, ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের নির্ধারিত আইনগত সীমা অপরিবর্তিত থাকলে বাড়তি ব্যয় সামাল দেওয়া কোম্পানিগুলোর জন্য কঠিন হতে পারে। এ অবস্থায় বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা করে আইডিআরের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সমন্বয় বা নির্দেশনা দেওয়া প্রয়োজন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

অন্যদিকে, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থার অবস্থান জানতে চাইলে আইডিআরের মুখপাত্র সাদিক আরমান বলেন, বর্তমান জ্বালানি মূল্যের বিষয়টি সম্পর্কে কর্তৃপক্ষ অবগত রয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

জ্বালানি ব্যয় বাড়ার এই প্রভাব শুধু কোম্পানির হিসাবের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। মাঠপর্যায়ে কর্মরত এজেন্ট ও কর্মকর্তাদের ব্যয় বেড়ে গেলে নতুন ব্যবসা সংগ্রহের কার্যক্রমেও তার প্রভাব পড়তে পারে। একই সঙ্গে কোম্পানিগুলোর ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের আইনগত সীমা মেনে চলার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ফলে বাড়তি পরিচালন ব্যয় ও নির্ধারিত ব্যয়ের সীমার মধ্যে ভারসাম্য কীভাবে রাখা হবে, সেটিই এখন বীমা খাতের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

মন্তব্য করুন