ভারতের বিমা খাতে গ্রাহকদের তথ্য ব্যবস্থাপনা আরও সহজ ও সমন্বিত করতে Public Insurance Registry (PIR) চালুর প্রস্তাব দিয়েছে Insurance Regulatory and Development Authority of India (IRDAI)। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে একজন গ্রাহক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে থাকা জীবন, স্বাস্থ্য, মোটরসহ একাধিক বিমা পলিসির তথ্য একটি সমন্বিত ডিজিটাল ব্যবস্থায় দেখতে পারবেন।
IRDAI-এর প্রস্তাবিত PIR-কে বিমা খাতের জন্য একটি Digital Public Infrastructure (DPI) হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হয়েছে। ভারতের বিভিন্ন খাতে ইতোমধ্যে ব্যবহৃত UPI, DigiLocker, Aadhaar-ভিত্তিক সেবা ও Co-WIN-এর মতো ডিজিটাল অবকাঠামোর অভিজ্ঞতা এই উদ্যোগের কাঠামো তৈরিতে বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। মূল লক্ষ্য হচ্ছে বিভিন্ন বিমা প্রতিষ্ঠানে বিচ্ছিন্নভাবে থাকা তথ্যকে একটি সংগঠিত ব্যবস্থার আওতায় আনা এবং গ্রাহক ও বিমা খাতের অন্যান্য অংশীজনের জন্য তথ্য ব্যবহারের প্রক্রিয়া সহজ করা।
Table of Contents
এক জায়গায় দেখা যাবে সব পলিসি
বর্তমানে একজন মানুষের একাধিক ধরনের বিমা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে থাকতে পারে। জীবনবিমা হয়তো একটি কোম্পানির কাছ থেকে নেওয়া, স্বাস্থ্যবিমা অন্য প্রতিষ্ঠানে এবং গাড়ির বিমা তৃতীয় কোনো কোম্পানি বা মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে করা হতে পারে। ফলে সব পলিসির তথ্য একসঙ্গে রাখা এবং নিয়মিত হালনাগাদ তথ্য জানা অনেকের জন্যই ঝামেলার হয়ে দাঁড়ায়।
কোন পলিসি সক্রিয় রয়েছে, কোনটির প্রিমিয়াম কখন দিতে হবে, নমিনি হিসেবে কার নাম রয়েছে কিংবা একজন গ্রাহকের মোট বিমা সুরক্ষা কত—এসব তথ্য জানতে বর্তমানে আলাদা আলাদা নথি, অ্যাকাউন্ট বা প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করতে হয়।
PIR চালু হলে গ্রাহকের সম্মতির ভিত্তিতে এসব পলিসির একটি সমন্বিত চিত্র তৈরি করা যেতে পারে। এতে নিজের বিমা পোর্টফোলিও সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া সহজ হবে। একই সঙ্গে বিভিন্ন পলিসির গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নজরে রাখার কাজও তুলনামূলকভাবে সহজ হতে পারে।
মৃত্যুর পর অজানা পলিসি শনাক্তের সুযোগ
প্রস্তাবিত রেজিস্ট্রির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহার হতে পারে অজানা বা অদাবিকৃত বিমা শনাক্ত করা। কোনো বিমাগ্রহীতার মৃত্যুর পর পরিবারের সদস্যরা অনেক সময় তার সব বিমা পলিসির তথ্য জানেন না। ফলে বৈধভাবে পাওনা অর্থ থাকলেও প্রয়োজনীয় তথ্যের অভাবে সেই অর্থের দাবি করা সম্ভব নাও হতে পারে।
প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় কোনো বিমাগ্রহীতার মৃত্যুদাবি প্রক্রিয়াকরণের পর দাবিদারের সম্মতি নিয়ে তথ্য রেজিস্ট্রিতে যুক্ত করা হলে একই ব্যক্তির নামে থাকা অন্য বিমা পলিসিগুলো শনাক্ত করার সুযোগ তৈরি হতে পারে। সংশ্লিষ্ট বিমা প্রতিষ্ঠানগুলোকে সম্ভাব্য দাবির বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্যও জানানো যেতে পারে।
এ ক্ষেত্রে পলিসির নম্বর জানা না থাকলেও অন্য পরিচিত তথ্যের মাধ্যমে বিমার সন্ধান পাওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। পরিবারের সদস্যদের জন্য এটি বিশেষভাবে কার্যকর হতে পারে, কারণ মৃত্যুর পর সব আর্থিক নথি বা পলিসির তথ্য পরিবারের কাছে থাকা সবসময় সম্ভব হয় না।
বারবার KYC জমা দেওয়ার ঝামেলা কমতে পারে
একাধিক বিমা পলিসি কেনার ক্ষেত্রে গ্রাহকদের প্রায়ই একই ধরনের KYC তথ্য ও নথি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে জমা দিতে হয়। PIR-এর প্রস্তাবিত কাঠামোতে গ্রাহকের যাচাই করা তথ্য তার সম্মতির ভিত্তিতে পুনরায় ব্যবহারের সুযোগ থাকতে পারে।
এর ফলে একটি বিমা প্রতিষ্ঠানে KYC সম্পন্ন করার পর অন্য প্রতিষ্ঠানে নতুন পলিসি নেওয়ার সময় একই তথ্য আবার জমা দেওয়ার প্রয়োজন কমতে পারে। গ্রাহকের সময় বাঁচানোর পাশাপাশি বিমা প্রতিষ্ঠানের তথ্য যাচাইয়ের প্রক্রিয়াও সহজ হতে পারে।
ফোন নম্বর, ই-মেইল, ঠিকানা, ব্যাংক হিসাব কিংবা নমিনির তথ্য পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও সমন্বিত ব্যবস্থার সুযোগ থাকতে পারে। তবে একটি পলিসিতে তথ্য পরিবর্তন করলে সেটি অন্য কোন কোন পলিসিতে কার্যকর হবে, সে বিষয়ে গ্রাহকের সম্মতি ও সুনির্দিষ্ট নিয়ম থাকা প্রয়োজন।
বিমা পণ্য তুলনায় বাড়তে পারে স্বচ্ছতা
PIR-এর প্রস্তাবিত সুবিধার মধ্যে বিভিন্ন বিমা পণ্যের তুলনা সহজ করার বিষয়টিও রয়েছে। কভারেজ, প্রিমিয়াম, সুবিধা, বর্জনীয় বিষয় এবং অপেক্ষার সময়ের মতো সাধারণ সূচক ব্যবহার করে বিভিন্ন পণ্য তুলনা করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বিমা পলিসির শর্ত অনেক সময় সাধারণ গ্রাহকের কাছে জটিল মনে হয়। একই ধরনের তথ্য একটি নির্দিষ্ট কাঠামোয় পাওয়া গেলে বিভিন্ন পণ্যের বৈশিষ্ট্য বোঝা তুলনামূলক সহজ হতে পারে। গ্রাহকের পছন্দের ভাষায় তথ্য উপস্থাপনের পরিকল্পনাও রয়েছে। এর ফলে ভাষাগত জটিলতা কমিয়ে বিমা পণ্য সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ বাড়তে পারে।
অভিযোগ ব্যবস্থাপনাতেও পরিবর্তনের সম্ভাবনা
প্রস্তাবিত PIR-এর আওতায় বিমা-সংক্রান্ত অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থাকে আরও সমন্বিত করার পরিকল্পনা রয়েছে। মোবাইল, অ্যাপ বা ওয়েবভিত্তিক ডিজিটাল মাধ্যমে অভিযোগ জানানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে গ্রাহকের পছন্দের ভাষায় সেবা দেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা হয়েছে।
‘Know Your Agent’ নামে একটি সুবিধা রাখার প্রস্তাবও রয়েছে। এর মাধ্যমে গ্রাহক কোনো বিমা এজেন্ট বা মধ্যস্থতাকারীর কাজের রেকর্ড, গ্রাহকদের করা অভিযোগ এবং সেবার মান সম্পর্কে তথ্য পাওয়ার সুযোগ পেতে পারেন। বিমা পলিসি কেনার আগে এজেন্ট বা মধ্যস্থতাকারী সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে এ ধরনের তথ্য সহায়ক হতে পারে।
এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি
Public Insurance Registry এখনো চালু হয়নি। এটি বর্তমানে প্রস্তাবের পর্যায়ে রয়েছে। IRDAI এ বিষয়ে একটি consultation paper প্রকাশ করে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামত চেয়েছে। ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত পাওয়া মতামত পর্যালোচনার পর প্রস্তাবিত কাঠামো নিয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
রেজিস্ট্রি চালুর আগে তথ্যের নিরাপত্তা ও গ্রাহকের গোপনীয়তার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পাবে। কারণ প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় ব্যক্তিগত পরিচয়, যোগাযোগ, ব্যাংক হিসাব, নমিনি এবং বিমা-সংক্রান্ত বিভিন্ন সংবেদনশীল তথ্য যুক্ত থাকতে পারে। এসব তথ্য কে দেখতে পারবেন, কোন পরিস্থিতিতে ব্যবহার করা যাবে এবং গ্রাহকের সম্মতি কীভাবে নেওয়া হবে—এসব বিষয় কার্যকর ব্যবস্থার জন্য স্পষ্ট করা প্রয়োজন হবে।
পুরোনো বিমা রেকর্ডকে একটি অভিন্ন ডিজিটাল কাঠামোয় আনা আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের তথ্যের ধরন ও সংরক্ষণ পদ্ধতিতে পার্থক্য থাকায় সেগুলোকে একই ব্যবস্থায় যুক্ত করতে তথ্যের সামঞ্জস্য ও নির্ভুলতা নিশ্চিত করতে হবে।
PIR বাস্তবায়িত হলে ভারতের বিমা খাতে গ্রাহকসেবার ধরনে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হতে পারে। একাধিক প্রতিষ্ঠানে থাকা পলিসির তথ্য এক জায়গায় দেখা, অজানা বিমা শনাক্ত করা, KYC-এর পুনরাবৃত্তি কমানো, বিমা পণ্যের তুলনা সহজ করা এবং অভিযোগ ব্যবস্থাপনাকে আরও সমন্বিত করার মতো সুবিধা এতে যুক্ত হতে পারে।
তবে এর কার্যকারিতা অনেকটাই নির্ভর করবে চূড়ান্ত কাঠামো, তথ্যের নিরাপত্তা, গ্রাহকের সম্মতি ব্যবস্থাপনা এবং বিভিন্ন বিমা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে তথ্য সমন্বয়ের ওপর। এখন তাই মূল নজর IRDAI-এর পরামর্শ প্রক্রিয়া ও পরবর্তী সিদ্ধান্তের দিকে।
