ভারতের নন-লাইফ বা সাধারণ বীমা খাতে ব্যবসার পরিমাণ বাড়লেও মূল বীমা কার্যক্রমে লোকসান উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশটির নন-লাইফ বীমাকারীদের সম্মিলিত আন্ডাররাইটিং লোকসান প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়ে ৪৫২.৭৯ বিলিয়ন রুপিতে দাঁড়িয়েছে। আগের অর্থবছর ২০২৪-২৫-এ এই লোকসানের পরিমাণ ছিল ৩০২.৮৮ বিলিয়ন রুপি।
এক বছরে লোকসানের পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ১৪৯.৯১ বিলিয়ন রুপি। অর্থাৎ বীমা কোম্পানিগুলোর প্রিমিয়াম আয় বাড়লেও পলিসি পরিচালনা, দাবি নিষ্পত্তি ও সংশ্লিষ্ট ব্যয়ের তুলনায় সেই আয় যথেষ্ট হয়নি। ফলে সামগ্রিক আন্ডাররাইটিং ফলাফলে বড় ধরনের অবনতি হয়েছে।
শিল্পখাতের তথ্যের বরাত দিয়ে ভারতের আর্থিক দৈনিক বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে নন-লাইফ বীমাকারীদের গ্রস ডাইরেক্ট প্রিমিয়াম ইনকাম বা মোট সরাসরি প্রিমিয়াম আয় প্রায় ৯ শতাংশ বেড়েছে। এ সময়ে প্রিমিয়াম আয় দাঁড়িয়েছে ৩.৩৬ ট্রিলিয়ন রুপিতে। পণ্য ও পরিষেবা কর বা জিএসটি হার যৌক্তিকীকরণের পর এই প্রবৃদ্ধি হয়েছে।
তবে প্রিমিয়াম আয়ের এই ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি আন্ডাররাইটিং লোকসান কমাতে পারেনি। বরং আয় বৃদ্ধির বিপরীতে লোকসান আরও দ্রুত বেড়েছে। এতে ভারতের নন-লাইফ বীমা খাতে ব্যবসা সম্প্রসারণের পাশাপাশি ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও ব্যয় নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি নতুন করে গুরুত্ব পেয়েছে।
Table of Contents
সরকারি বীমাকারীদের লোকসান সবচেয়ে বেশি
আন্ডাররাইটিং ফলাফলের অবনতিতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে ভারতের চারটি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সাধারণ বীমা প্রতিষ্ঠান। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এসব সরকারি সাধারণ বীমাকারীর সম্মিলিত আন্ডাররাইটিং লোকসান আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৫৮.৩ শতাংশ বেড়েছে।
ওই অর্থবছরে তাদের মোট আন্ডাররাইটিং লোকসান দাঁড়িয়েছে ২৯০.৭ বিলিয়ন রুপি। ফলে পুরো নন-লাইফ বীমা খাতের লোকসান বৃদ্ধিতে সরকারি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর অবদান ছিল উল্লেখযোগ্য।
বীমা ব্যবসায় শুধু প্রিমিয়াম সংগ্রহ বাড়লেই আর্থিক ফলাফল ভালো হয় না। একটি প্রতিষ্ঠান যে পরিমাণ প্রিমিয়াম সংগ্রহ করছে, তার বিপরীতে কতটা দাবি উঠছে এবং সেই দাবি নিষ্পত্তিতে কী পরিমাণ ব্যয় হচ্ছে—এসব বিষয়ও আন্ডাররাইটিং ফলাফল নির্ধারণ করে। সরকারি বীমাকারীদের ক্ষেত্রে লোকসানের বড় বৃদ্ধি সেই চাপের বিষয়টি স্পষ্ট করেছে।
বেসরকারি খাতেও বেড়েছে লোকসান
বেসরকারি সাধারণ বীমা কোম্পানিগুলোর অবস্থাও পুরোপুরি ইতিবাচক নয়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এসব প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত আন্ডাররাইটিং লোকসান ছিল ১৪০.৩৩ বিলিয়ন রুপি। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা ১৮.৯ শতাংশ বেড়ে ১৬৬.৮২ বিলিয়ন রুপিতে পৌঁছেছে।
সরকারি প্রতিষ্ঠানের তুলনায় বেসরকারি সাধারণ বীমাকারীদের লোকসান বৃদ্ধির হার কম হলেও সামগ্রিক প্রবণতা একই। অর্থাৎ উভয় খাতেই প্রিমিয়াম ব্যবসার বিস্তারের পাশাপাশি আন্ডাররাইটিং পর্যায়ে চাপ তৈরি হয়েছে।
স্বাস্থ্যবীমায় আরও বড় চাপ
নন-লাইফ বীমা খাতের মধ্যে স্বতন্ত্র স্বাস্থ্যবীমা কোম্পানিগুলোর আন্ডাররাইটিং ফলাফলও উল্লেখযোগ্যভাবে খারাপ হয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তাদের সম্মিলিত আন্ডাররাইটিং লোকসান ছিল ১৬৩.৫২ বিলিয়ন রুপি। এক বছর পর তা ৬৩ শতাংশ বেড়ে ২৬৬.৬৮ বিলিয়ন রুপিতে দাঁড়িয়েছে।
স্বাস্থ্যবীমা খাতে লোকসানের এই বড় বৃদ্ধি সামগ্রিক বীমা বাজারের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ স্বাস্থ্যবীমায় প্রিমিয়াম সংগ্রহের পাশাপাশি পলিসির আওতায় আসা চিকিৎসা-সংক্রান্ত দাবির খরচ আন্ডাররাইটিং ফলাফলে সরাসরি প্রভাব ফেলে। মূল প্রতিবেদনে স্বাস্থ্যবীমা খাতের লোকসান বৃদ্ধির নির্দিষ্ট কারণ আলাদাভাবে উল্লেখ করা হয়নি।
স্বতন্ত্র স্বাস্থ্যবীমা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কেয়ার হেলথ ইন্স্যুরেন্স লিমিটেডের আন্ডাররাইটিং লোকসান ছিল উল্লেখযোগ্য। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটির লোকসান দাঁড়িয়েছে ৬.৬০ বিলিয়ন রুপিতে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই অঙ্ক ছিল ৩.২৮ বিলিয়ন রুপি। ফলে এক বছরের ব্যবধানে প্রতিষ্ঠানটির আন্ডাররাইটিং লোকসান বেড়েছে ১০১.৩ শতাংশ।
আয় বাড়লেও কেন উদ্বেগ
আন্ডাররাইটিং হলো বীমা প্রতিষ্ঠানের মূল ব্যবসার আর্থিক ফলাফল বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। সাধারণভাবে প্রিমিয়াম থেকে পাওয়া আয় এবং পলিসির বিপরীতে দাবি ও সংশ্লিষ্ট ব্যয়ের মধ্যে যে ভারসাম্য তৈরি হয়, তার ওপর এই ফলাফল নির্ভর করে। তাই প্রিমিয়াম আয় বাড়ার পরও যদি দাবি ও অন্যান্য খরচ আরও দ্রুত বাড়ে, তাহলে আন্ডাররাইটিং লোকসান তৈরি হতে পারে।
ভারতের ২০২৫-২৬ অর্থবছরের পরিসংখ্যানে ঠিক এমন একটি বৈপরীত্য দেখা যাচ্ছে। নন-লাইফ বীমাকারীদের মোট সরাসরি প্রিমিয়াম আয় প্রায় ৯ শতাংশ বেড়ে ৩.৩৬ ট্রিলিয়ন রুপিতে পৌঁছেছে। একই সময়ে আন্ডাররাইটিং লোকসান প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়ে ৪৫২.৭৯ বিলিয়ন রুপিতে দাঁড়িয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে বীমা কোম্পানিগুলোর সামনে মূল চ্যালেঞ্জ হচ্ছে ব্যবসার প্রবৃদ্ধির সঙ্গে লাভজনকতা ধরে রাখা। নতুন পলিসি বিক্রি ও প্রিমিয়াম সংগ্রহ বাড়ানোর পাশাপাশি ঝুঁকি মূল্যায়ন, দাবি ব্যবস্থাপনা এবং পরিচালন ব্যয়ের ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা জরুরি হয়ে উঠেছে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরের তথ্য ভারতের নন-লাইফ বীমা বাজারের একটি মিশ্র চিত্র তুলে ধরেছে। বাজারে প্রিমিয়াম আয় বাড়ছে, কিন্তু একই সঙ্গে মূল বীমা কার্যক্রমের লোকসানও দ্রুত বাড়ছে। বিশেষ করে সরকারি সাধারণ বীমাকারী এবং স্বতন্ত্র স্বাস্থ্যবীমা প্রতিষ্ঠানগুলোর লোকসান বৃদ্ধির হার খাতটির আর্থিক চাপকে আরও স্পষ্ট করেছে।
