জীবন বীমা কেবল একটি ঝুঁকি বহনের চুক্তি নয়, এটি দীর্ঘমেয়াদী সঞ্চয়েরও একটি মাধ্যম। আধুনিক বীমা ব্যবস্থায় প্রতিযোগিতামূলক বাজারে বীমাগ্রহীতাদের আকৃষ্ট করতে এবং তাদের স্বার্থ রক্ষার্থে বীমাকারীগণ যে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা প্রদান করেন, তার মধ্যে সমর্পণ মূল্য বা ‘সারেন্ডার ভ্যালু’ (Surrender Value) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি এমন এক আর্থিক অধিকার যা দীর্ঘমেয়াদী বীমা চুক্তি মাঝপথে ভেঙে ফেললেও বীমাগ্রহীতাকে সম্পূর্ণ রিক্ত হতে দেয় না। সমর্পণ মূল্য নির্ধারণের প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত কারিগরি এবং গাণিতিক। এই মূল্য যথার্থভাবে হিসেব করা না হলে বীমা প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়তে পারে এবং প্রতিষ্ঠানের দেউলিয়া হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। তাই, জীবন বীমায় সমর্পণ মূল্য নির্ধারণ বা হিসেবকরণের ক্ষেত্রে বীমা গণিতবিদগণ (Actuaries) সুনির্দিষ্ট তাত্ত্বিক পন্থা বা ভিত্তি অনুসরণ করে থাকেন।

Table of Contents
সমর্পণ মূল্য: সংজ্ঞা ও প্রেক্ষাপট
কোনো নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য গৃহীত আজীবন বা মেয়াদী জীবন বীমা পলিসি চালুর রাখার পর, বীমাগ্রহীতা যদি কোনো কারণে ভবিষ্যতের প্রিমিয়াম প্রদানে অসমর্থ হন বা অন্য কোনো ব্যক্তিগত কারণে পলিসিটি চালু রাখতে না চান, তবে তিনি বীমা কোম্পানির কাছে পলিসিটি সমর্পণ বা বাতিল করার আবেদন করতে পারেন। এমতাবস্থায়, বীমা কোম্পানি ওই বীমাপত্রটি বাতিল করে দেয় এবং বীমাগ্রহীতাকে চুক্তি মোতাবেক প্রদত্ত প্রিমিয়ামের একটি নির্দিষ্ট অংশ ফেরত প্রদান করে। ফেরতযোগ্য এই অর্থকেই সমর্পণ মূল্য বলা হয়। সাধারণত বীমাপত্র ইস্যু করার পর থেকে একটি নির্দিষ্ট সময় (সাধারণত দুই বা তিন বছর) অতিক্রান্ত হওয়ার পূর্বে এবং নির্দিষ্ট সংখ্যক প্রিমিয়াম পরিশোধের আগে সমর্পণ মূল্য অর্জিত হয় না।
সমর্পণ মূল্য গণনার আবশ্যকতা
যদি সমর্পণ মূল্য প্রদানের ক্ষেত্রে কোনো নির্দিষ্ট নিয়ম-নীতি অনুসৃত না হয়, তবে বীমাগ্রহীতা বা বীমাকারী—যেকোনো এক পক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। যদি খুব কম মূল্য দেওয়া হয়, তবে বীমাগ্রহীতার আস্থা নষ্ট হবে। আবার, যদি খুব বেশি মূল্য দেওয়া হয়, তবে বীমা কোম্পানি প্রদত্ত ঝুঁকির ব্যয় মিটাতে পারবে না। তাই, একটি বৈজ্ঞানিক ও ভারসাম্যপূর্ণ সমর্পণ মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থা বীমা প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদী অস্তিত্বের জন্য অপরিহার্য। সমর্পণ মূল্য যথার্থভাবে হিসেব করার জন্য বীমাকারীগণ প্রধানত দু’টি তাত্ত্বিক পন্থা বা ভিত্তি অনুসরণ করে থাকেন:
১। পুঞ্জীকরণ বা পুঞ্জীভবন পন্থা (The Accumulation Approach)
২। সঞ্চয়ন পদ্ধতি বা পন্থা (The Saving Approach)
নিম্নে এই দুটি পন্থা এবং এগুলোর আওতাভুক্ত বিভিন্ন উপাদান সম্পর্কে বিস্তারিত বিশ্লেষণ প্রদান করা হলো।
১. পুঞ্জীকরণ বা পুঞ্জীভবন পন্থা (Accumulation Approach)
এই পন্থায় সমর্পণ মূল্য নির্ধারণের মূল ভিত্তি হলো বীমাগ্রহীতা কর্তৃক এযাবৎ প্রদত্ত প্রিমিয়াম এবং তার উপর অর্জিত সুদের সঠিক পুঞ্জীভবন। ধারণাটি হলো, বীমাগ্রহীতা যা জমা দিয়েছেন এবং ওই জমার বিপরীতে কোম্পানি যা আয় করেছে, তা থেকে কোম্পানির প্রকৃত খরচ এবং দাবির অংশ বাদ দিলে যা অবশিষ্ট থাকে, সেটাই সমর্পণ মূল্যের ভিত্তি হওয়া উচিত। এই পদ্ধতিতে সঞ্চিতিকে (Reserve) সমর্পণ মূল্য প্রদানের আধার হিসেবে গণ্য করা হয়।
সঞ্চিতি বা রিজার্ভ হিসেব করা হয় মোট প্রিমিয়ামের উপর ভিত্তি করে। সংগৃহীত মোট প্রিমিয়াম থেকে প্রশাসনিক ও অন্যান্য খরচাবলী বাদ দেওয়া হয়। এভাবে সকল প্রদত্ত নীট প্রিমিয়াম এবং তার সাথে অর্জিত সুদ যুক্ত হয়ে যে মোট অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায়, তা থেকে মৃত বীমাগ্রহীতাদের আনুপাতিক দাবীর অংশ (Cost of Insurance) এবং বীমাকারীর সমগ্র পরিচালন খরচাদি বাদ দেওয়ার পর যা অবশিষ্ট থাকে, তাকেই ‘সাকল্য সঞ্চিতি’ বা গ্রস রিজার্ভ গণ্য করা হয়।
গাণিতিক ভাষায়: সাকল্য সঞ্চিতি = (সংগৃহীত নীট প্রিমিয়াম + অর্জিত সুদ) – (মৃত্যু দাবির আনুপাতিক অংশ + পরিচালন খরচাদি)।
সাকল্য সঞ্চিতি ও সমর্পণ মূল্যের মধ্যকার ব্যবধান
কোনো নির্দিষ্ট বীমাপত্র বাবদ সৃষ্ট সাকল্য সঞ্চিতির সম্পূর্ণটাই সমর্পণ মূল্য হিসেবে প্রদান করা হয় না। এর প্রধান কারণ হলো, বীমাপত্রটি মাঝপথে সমর্পণ করার ফলে বীমাকারী প্রতিষ্ঠানের কিছু আনুষ্ঠানিক ও আর্থিক ক্ষতি হয়। উপরন্তু, নির্দিষ্ট কিছু বীমাপত্রে যেমন—সাময়িক বীমাপত্র (Term Insurance), বিশুদ্ধ মেয়াদী বীমাপত্র (Pure Endowment)—এগুলোতে সমর্পণ মূল্য প্রদান করা হয় না, কারণ এগুলোতে প্রিমিয়ামের পরিমাণ খুব কম থাকে এবং কোনো সঞ্চয়ী উপাদান থাকে না। তাই, সমর্পণ মূল্য প্রদানের সময় সাকল্য সঞ্চিতি থেকে কিছু নির্দিষ্ট খরচ বা কর্তন বাদ দিতে হয়।
সুতরাং, সমর্পণ মূল্য = সাকল্য সঞ্চিতি – সমর্পণ খরচাবলী।
সমর্পণ খরচাবলী (Surrender Charges): সাকল্য সঞ্চিতি থেকে কর্তনের কারণসমূহ
সমর্পণ মূল্য নিরূপণের ক্ষেত্রে সাকল্য সঞ্চিতি থেকে যে কর্তনগুলি করা হয়, সে সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকা প্রয়োজন। নিম্নে প্রধান সমর্পণ খরচাবলী বা কর্তনের ভিত্তিগুলো আলোচনা করা হলো:
(ক) প্রারম্ভিক বা প্রাথমিক খরচাবলী (Primary Expenditures): বীমাচুক্তি গঠন ও সম্পাদনের প্রাথমিক পর্যায়ে প্রচুর অর্থ ব্যয় হয়। এর মধ্যে প্রস্তাবনার যাবতীয় প্রক্রিয়া নিস্পন্ন করার খরচ, ডাক্তারী পরীক্ষার ফি, প্রতিনিধি বা এজেন্টের দস্তুরী (Commission), এবং বীমাপত্র ইস্যু করার প্রশাসনিক খরচ অন্তর্ভুক্ত। এই খরচের পরিমাণ এতো বেশি যে, তা প্রথম বছরের প্রিমিয়ামের সম্পূর্ণ অর্থ দিয়েও মিটানো সম্ভব হয় না। বীমাকারী এই খরচ পুরো মেয়াদের প্রিমিয়ামের মধ্যে আনুপাতিকহারে বণ্টন করে দেন। কিন্তু বীমাপত্রটি দ্রুত সমর্পণ করা হলে, বণ্টনকৃত এই প্রারম্ভিক খরচের একটি বড় অংশ অপূর্ণ থেকে যায়। এমতাবস্থায়, বীমাকারীকে উক্ত অপূর্ণ অংশ সঞ্চিতি থেকে কেটে নিতে হয়।
(খ) প্রতিকূল মৃত্যুহার নির্বাচন (Adverse Mortality Selection): এটি সমর্পণ মূল্য গণনার একটি অত্যন্ত জটিল ও বৈজ্ঞানিক দিক। ধারণা করা হয়, যে সব বীমাগ্রহীতা খুবই দুর্বল ও রুগ্ন স্বাস্থ্যের অধিকারী, তারা বীমাপত্র চালু রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেন, কারণ তাদের ক্ষেত্রে বীমাদাবী পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। পক্ষান্তরে, যারা অপেক্ষাকৃত সু-স্বাস্থ্যের অধিকারী এবং যারা দীর্ঘকাল বেঁচে থাকবেন বলে আশা করেন, তারাই সাধারণত আর্থিক প্রয়োজনে বা অন্য কারণে বীমাপত্র সমর্পণ করেন। ফলে, যারা থেকে যান তাদের গড় মৃত্যুহার বেড়ে যায়, যার আর্থিক বোঝা বীমাকারীর উপর পড়ে। এই ভবিষ্যতের প্রতিকূল মৃত্যুহারের ঝুঁকি মোকাবেলার জন্য সমর্পণ মূল্যের অর্থ থেকে একটি অংশ কর্তন করা হয়।
(গ) মন্দাকালীন সমর্পণের বাড়তি খরচ ও ঝুঁকি (Excess Expenditures/Risk during Depression): অর্থনৈতিক মন্দার সময় মানুষের হাতে অর্থের অভাব ঘটে, ফলে বীমাপত্র সমর্পণের প্রবণতা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। এই হিড়িক বীমা প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ভিত্তিকে দুর্বল করে ফেলে এবং বিনিয়োগ তহবিল কমিয়ে দেয়। অনেক সময় নগদ অর্থের চাহিদা মেটাতে বীমাকারীকে প্রতিষ্ঠানের কিছু বিনিয়োগ বা সম্পত্তি বিক্রি করতে হয়, যা মন্দার বাজারে লোকসানে বিক্রি করতে হতে পারে। এরূপ পরিস্থিতিতে সমর্পণের আর্থিক ফলাফল প্রতিষ্ঠানের জন্য যথেষ্ট অসুবিধার কারণ হয়। তাই, এরূপ ক্ষেত্রে সমর্পণ মূল্য বিনিয়োগকৃত অংশ থেকে প্রাপ্তব্যের বেশি হওয়া উচিত নয় এবং এর জন্য সঞ্চিতি থেকে কর্তন করা হয়।
(ঘ) আপদকালীন সঞ্চিত তহবিলে বরাদ্দ বা অবদান (Contribution to Contingency Reserve): ভবিষ্যতের আর্থিক দুর্যোগ বা অপ্রত্যাশিত দাবি কাটিয়ে ওঠার জন্য বীমাকারীগণ তাদের অর্জিত লাভ থেকে একটি আপদকালীন সঞ্চিত তহবিল (Contingency Fund) সৃষ্টি করে রাখেন। প্রত্যেক বীমাগ্রহীতা বা বীমাপত্র বাবদ একটি নির্দিষ্ট পরিমানের অর্থ এই তহবিলে রাখা হয়। যখন কোনো বীমাপত্র সমর্পণ করা হয়, তখন ওই বীমাপত্র থেকে এই তহবিলে আর কোনো অবদান আসবে না। তাই, সমর্পণ মূল্য নিরূপণের ক্ষেত্রে এই আপদকালীন তহবিলের অংশটি বিবেচনায় নিয়ে সঞ্চিতি থেকে কর্তন করা হয়।
(ঙ) মুনাফা খাতে অর্থ সংরক্ষণ (Contribution to Profit): বীমা একটি কারবার, এবং কারবারের মুনাফা খাতে প্রতিটি বীমাপত্র বাবদ একটি স্বাভাবিক আর্থিক অংশগ্রহণ বা অবদান বর্তায়। যখন একটি বীমাপত্র সমর্পণ করা হয়, তখন ওই বীমাপত্র থেকে ভবিষ্যতে মুনাফা খাতে যে অর্থ বণ্টিত হতো বা অর্জিত হতো, তা বন্ধ হয়ে যায়। এই ভবিষ্যতের মুনাফা হ্রাসের ক্ষতিপূরণস্বরূপ সমর্পণ মূল্য থেকে কিছু অংশ কেটে রাখা হয়।
(চ) সমর্পণের প্রশাসনিক খরচ (Cost of Surrender Processing): বীমাপত্রটি যখন সমর্পণ করা হয়, তখন ওই সমর্পণ প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে—যেমন কাগজপত্রের কাজ, গণনা, চেক ইস্যু ইত্যাদি—বীমা কোম্পানিকে কিছু প্রশাসনিক অর্থ ব্যয় করতে হয়। এই নির্দিষ্ট সমর্পণ প্রক্রিয়ার খরচও সমর্পণ মূল্য নির্ধারণে বিবেচনা করা হয় এবং তা সঞ্চিতি থেকে কেটে নেওয়া হয়।
২. সঞ্চয়ন পদ্ধতি বা পন্থা (Saving Approach)
সমর্পণ মূল্য নির্ধারণের দ্বিতীয় প্রধান ভিত্তি হলো সঞ্চয়ন পদ্ধতি। এই পদ্ধতিটিকে অধিকতর বৈজ্ঞানিক এবং যুক্তিযুক্ত হিসেবে বিবেচনা করা হয় কারণ এটি সমর্পণ মূল্য পরিশোধের প্রকৃত কারণ এবং এর ফলে বীমাকারীর ভবিষ্যতের আর্থিক দায়মুক্তির বিষয়টি স্পষ্ট করে।
চুক্তি মোতাবেক বীমাপত্র চালু থাকলে বীমাকারীকে ভবিষ্যতে মৃত্যুতে বা মেয়াদপূর্তিতে বীমাদাবী পরিশোধ করতে হতো। কিন্তু একটি বীমাপত্র মাঝপথে সমর্পণ করা হলে, বীমাকারী উক্ত বীমাপত্রের বীমাদাবী পরিশোধের ভবিষ্যত দায় থেকে অব্যাহতি লাভ করেন। বীমাদাবী পরিশোধ করা থেকে এই অব্যাহতি পাওয়ার ফলে বীমাকারীর ভবিষ্যতে যে পরিমাণ অর্থের ‘সঞ্চয়’ হয়, তার ওপর ভিত্তি করেই এই পদ্ধতিতে সমর্পণ মূল্য নির্ধারণ করা হয়। তাই সাময়িক বীমাপত্র ও বিশুদ্ধ মেয়াদী বীমাপত্র—যেখানে বীমাদাবী পরিশোধের নিশ্চয়তা কম বা সঞ্চয়ী উপাদান নেই, সেখানে এই পদ্ধতি অনুযায়ী সমর্পণ মূল্য দেওয়া লোকসান সৃষ্টির কারণ হয়।
এই পদ্ধতিতে সমর্পণ মূল্য হিসেব করার সময়, বীমাপত্রটি সমর্পিত না হয়ে যদি চালু থাকত, তাহলে বীমাকারী ভবিষ্যতে যে পরিমাণ কিস্তির অর্থ (Premium) এবং বিনিয়োগকৃত কিস্তি বাবদ সুদ পেতেন, পক্ষান্তরে যে পরিমাণ খরচাবলী এবং বীমাদাবী পরিশোধ করতে হতো—এই সবকিছুর একটি বর্তমান মূল্য (Present Value) নিরূপণ করা হয়। অর্থাৎ, পরিশোধ না করার ফলে ভবিষ্যতে কি পরিমাণ সঞ্চয় হলো তা বীমাপত্রের সমর্পণ তারিখ থেকে মেয়াদ পূর্তি অথবা বীমাকৃত ব্যক্তির মৃত্যু অবধি ভাবী লেনদেন বিবেচনার পরেই হিসেব করা সম্ভব।
সঞ্চয়ন পদ্ধতিতে সমর্পণ মূল্য গণনার সূত্র
গণনাবিদগণ (Actuaries) সব কিছু বিবেচনা ও হিসেব-নিকেশ করেই সর্বাধিক সমর্পণ মূল্য প্রদানের সুযোগ সৃষ্টি করতে সচেষ্ট থাকেন। এই পন্থায় সমর্পণ মূল্য হিসেবের জন্য নিম্নোক্ত সাধারণ সূত্রটি ব্যবহার করা হয়:
সমর্পণ মূল্য = (বীমাকৃত অর্থের বর্তমান মূল্য – ভবিষ্যৎ খরচাবলী খাতে পুঞ্জীকৃত অর্থের বর্তমান মূল্য + অংশগ্রহণকারী বীমাপত্রে ভাবীস্বত্ব বিশিষ্ট বোনাসের বর্তমান মূল্য) – (ভবিষ্যতে প্রাপ্য বীমাকিস্তির পুঞ্জীকৃত পরিমাণের বর্তমান মূল্য + সমর্পণ মূল্য প্রদানের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার খরচাবলী)।
(plain text format for the formula: সমর্পণ মূল্য = (বীমাকৃত অর্থের বর্তমান মূল্য – ভবিষ্যৎ খরচাবলী খাতে পুঞ্জীকৃত অর্থের বর্তমান মূল্য + অংশগ্রহণকারী বীমাপত্রে ভাবীস্বত্ব বিশিষ্ট বোনাসের বর্তমান মূল্য) – (ভবিষ্যতে প্রাপ্য বীমাকিস্তির পুঞ্জীকৃত পরিমাণের বর্তমান মূল্য + সমর্পণ মূল্য প্রদানের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার খরচাবলী))
এক নজরে
- সমর্পণ মূল্যের সংজ্ঞা: বীমাগ্রহীতা পলিসি চালু রাখতে অসমর্থ হলে প্রদত্ত প্রিমিয়ামের যে নির্দিষ্ট অংশ বীমাকারী ফেরত দেন, তাকে সমর্পণ মূল্য বলে। এটি সাধারণত প্রথম ২-৩ বছরের মধ্যে অর্জিত হয় না।
- নির্ধারণের গুরুত্ব: যথার্থভাবে সমর্পণ মূল্য নির্ধারণ না করলে বীমা প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ক্ষতি অনিবার্য এবং প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকা কঠিন।
- প্রধান দু’টি ভিত্তি: সমর্পণ মূল্য নির্ধারণের জন্য ১। পুঞ্জীকরণ পন্থা এবং ২। সঞ্চয়ন পন্থা অনুসরণ করা হয়।
- পুঞ্জীকরণ পন্থা: এটি সাকল্য সঞ্চিতি বা রিজার্ভের উপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হয়।
- সূত্র: সমর্পণ মূল্য = সাকল্য সঞ্চিতি – সমর্পণ খরচাবলী।
- সমর্পণ খরচাবলীর উপাদানসমূহ: প্রাথমিক খরচ, প্রতিকূল মৃত্যুহার নির্বাচন, মন্দাকালীন সমর্পণের ঝুঁকি, আপদকালীন সঞ্চিতিতে অবদান, মুনাফাখাতে অবদান, এবং সমর্পণের প্রশাসনিক খরচ।
- সঞ্চয়ন পদ্ধতি: এটি অধিকতর বৈজ্ঞানিক এবং বীমাকারীর ভবিষ্যতের বীমাদাবী পরিশোধের দায় থেকে অব্যাহতির ফলে যে সঞ্চয় হয়, তার উপর ভিত্তি করে নির্ধারিত।
- ব্যবহারিক প্রয়োগ: গণনা বিশেষজ্ঞগণ (Actuaries) এই জটিল গাণিতিক ও পরিসংখ্যানগত কাজটি সম্পন্ন করেন, যেখানে তারা বীমাগ্রহীতাদের জন্য সর্বাধিক সুযোগ এবং বীমা কোম্পানির আর্থিক স্থিতিশীলতার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখেন।

সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলী (FAQ)
১. সমর্পণ মূল্য (Surrender Value) বলতে কী বোঝায়? জীবন বীমাগ্রহীতা যদি নির্দিষ্ট মেয়াদের পূর্বে পলিসিটি চালু রাখতে অসমর্থ হন বা না চান, তবে তিনি বীমা কোম্পানির কাছে পলিসিটি বাতিল করে প্রদত্ত প্রিমিয়ামের একটি অংশ ফেরত পাওয়ার আবেদন করতে পারেন। বীমা কোম্পানি চুক্তি মোতাবেক যে অর্থ ফেরত দেয়, তাকে সমর্পণ মূল্য বলে।
২. সমর্পণ মূল্য নির্ধারণের প্রধান ভিত্তি কয়টি ও কী কী? সমর্পণ মূল্য নির্ধারণের প্রধান ভিত্তি দু’টি। যথা: ১। পুঞ্জীকরণ বা পুঞ্জীভবন পন্থা (Accumulation Approach) এবং ২। সঞ্চয়ন পদ্ধতি বা পন্থা (Saving Approach)।
৩. পুঞ্জীকরণ পন্থায় সমর্পণ মূল্য কীভাবে গণনা করা হয়? এই পন্থায়, সাকল্য সঞ্চিতি বা গ্রস রিজার্ভ থেকে সমর্পণ খরচাবলী (Surrender Charges) বাদ দিয়ে সমর্পণ মূল্য গণনা করা হয়। অর্থাৎ, সমর্পণ মূল্য = সাকল্য সঞ্চিতি – সমর্পণ খরচাবলী।
৪. সমর্পণ খরচাবলীর (Surrender Charges) অন্তর্ভুক্ত প্রধান উপাদানগুলি কী কী? সমর্পণ খরচাবলীর অন্তর্ভুক্ত প্রধান উপাদানগুলি হলো: প্রাথমিক বা প্রারম্ভিক খরচাবলী, প্রতিকূল মৃত্যুহার নির্বাচনের ঝুঁকি, মন্দাকালীন সমর্পণের বাড়তি খরচ, আপদকালীন সঞ্চিত তহবিলে বরাদ্দ, মুনাফাখাতে অর্থ সংরক্ষণ এবং সমর্পণের প্রশাসনিক খরচ।
৫. সঞ্চয়ন পদ্ধতিকে (Saving Approach) কেন বিজ্ঞানসম্মত বলা হয়? সঞ্চয়ন পদ্ধতিতে সমর্পণ মূল্য নির্ধারণ করা হয় বীমাপত্রটি মাঝপথে বাতিল করার ফলে বীমাকারীর ভবিষ্যতের বীমাদাবী পরিশোধের দায় থেকে যে অব্যাহতি লাভ হয় এবং তার ফলে যে পরিমাণ অর্থের ‘সঞ্চয়’ হয়, তার ওপর ভিত্তি করে। এটি সমর্পণ মূল্য পরিশোধের কারণ ও যুক্তি স্পষ্ট করে, তাই একে বিজ্ঞানসম্মত বলা হয়।
৬. সব ধরণের জীবন বীমা পলিসিতে কি সমর্পণ মূল্য পাওয়া যায়? না, সব ধরণের পলিসিতে সমর্পণ মূল্য পাওয়া যায় না। বিশেষ করে সাময়িক বীমাপত্র (Term Insurance) বা বিশুদ্ধ মেয়াদী বীমাপত্র (Pure Endowment)—যেগুলোতে প্রিমিয়ামের পরিমাণ খুব কম থাকে এবং কোনো সঞ্চয়ী উপাদান থাকে না, সেগুলোতে সাধারণত সমর্পণ মূল্য প্রদান করা হয় না।
৭. সমর্পণ মূল্য কে নির্ধারণ করেন? সমর্পণ মূল্য নির্ধারণের কাজটি বীমা প্রতিষ্ঠানের গণনা বিশেষজ্ঞগণ বা অ্যাকচুয়ারিগণ (Actuaries) সম্পন্ন করে থাকেন। তারা জটিল গাণিতিক ও পরিসংখ্যানগত বিশ্লেষণের মাধ্যমে এই মূল্য নির্ধারণ করেন।
