বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতির প্রভাব, সুদের হারের ওঠানামা এবং প্রিমিয়ামের হার কিছুটা কমে আসা সত্ত্বেও টানা তৃতীয় বছরের মতো নিজেদের মূলধন খরচের চেয়ে বেশ ভালো হারে মুনাফা অর্জন করেছে বৈশ্বিক পুনর্বীমা বা রিইনস্যুরেন্স খাত। চুক্তির শর্তাবলি কঠোরকরণ, নতুন করে প্রিমিয়ামের দাম পুনর্নির্ধারণ এবং সুনির্দিষ্টভাবে ঝুঁকি কমানোর কৌশলের ওপর ভর করেই এ খাতের আন্ডাররাইটিং ব্যবসায় অত্যন্ত শক্তিশালী ফলাফল অর্জিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক ক্রেডিট রেটিং ও আর্থিক তথ্য বিশ্লেষণকারী সংস্থা ‘এএম বেস্ট’-এর এক সাম্প্রতিক বাজার প্রতিবেদনে এই ইতিবাচক চিত্র উঠে এসেছে।
সংস্থাটির প্রকাশিত ‘রিইনস্যুরার্স রিটার্নস এক্সিড কস্ট অব ক্যাপিটাল ডেসপাইট সফটেনিং মার্কেট’ শীর্ষক বিশ্লেষণাত্মক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫ সালে বিশ্বজুড়ে পুনর্বীমা খাত গড়ে ১৬.৩ শতাংশ মধ্যমা ইকুইটি রিটার্ন (রিটার্ন অন ইকুইটি) অর্জন করেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে এটি ২০২৩ সালের সর্বকালের রেকর্ড আয়ের চেয়ে সামান্য কম হলেও বৈশ্বিক সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে বিবেচনা করলে অত্যন্ত লাভজনক একটি বছর হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রচুর নতুন মূলধনের আগমন এবং বীমা করার মোট সক্ষমতা বৃদ্ধি পাওয়ায় বাজারে প্রিমিয়ামের হার বা ফি কিছুটা কমে যাওয়ার একটি ঝোঁক তৈরি হয়েছিল, যাকে বীমা শিল্পে ‘সফটেনিং মার্কেট’ বলা হয়। কিন্তু কৌশলগত নিয়ন্ত্রণের কারণে এই বাজার শিথিলতার মধ্যেও আন্ডাররাইটিংয়ের মুনাফায় কোনো ধাক্কা লাগেনি।
প্রতিবেদনে খাতভিত্তিক পরিসংখ্যান তুলে ধরে উল্লেখ করা হয়, ২০২৫ সালে এ খাতের গড় মূলধন খরচ (ওয়েটেড অ্যাভারেজ কস্ট অব ক্যাপিটাল) বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ৮.২৩ শতাংশে, যা ২০২৪ সালে ছিল ৭.৬৭ শতাংশ। মূলধন খরচের এই ঊর্ধ্বমুখী ধারা চলতি ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) আরও বৃদ্ধি পেয়ে ৮.৬৩ শতাংশে গিয়ে পৌঁছেছে। যদিও অনেক কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার কিছুটা কমিয়ে এনেছে, তা সত্ত্বেও টানা চার বছর ধরে ইকুইটির নিজস্ব মূলধন খরচ বেড়ে ৯.৬ শতাংশে পৌঁছানোর কারণেই মূলত সামগ্রিক মূলধন খরচ কিছুটা চড়া হয়েছে।
এএম বেস্ট-এর জ্যেষ্ঠ শিল্প বিশ্লেষক হেলেন অ্যান্ডারসেন বিশ্ব বাজারের এ পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে উল্লেখ করেন, আন্তর্জাতিক বাজারে বীমা ফি বা প্রিমিয়ামের ওপর কিছুটা চাপ তৈরি হলেও পুনর্বীমা কোম্পানিগুলো চুক্তির কাঠামোগত কঠোর শর্ত থেকে সরে আসেনি। বিশেষ করে তারা অ্যাটাচমেন্ট পয়েন্ট বা নিজেদের আর্থিক দায়ভার শুরু হওয়ার প্রাথমিক মাত্রাটি উঁচুতে ধরে রাখতে পেরেছে। এর ফলে দ্বিতীয় সারির প্রাকৃতিক দুর্যোগ—যেমন মাঝারি মানের ঝড়, শিলাবৃষ্টি কিংবা আকস্মিক বন্যার মতো ঝুঁকির মুখোমুখি হলেও আন্ডাররাইটিং থেকে হওয়া ক্ষতির পরিমাণ অনেক কম রাখা সম্ভব হয়েছে।
ধারাবাহিকভাবে তিন বছর ধরে মূলধন খরচের চেয়ে অর্জিত রিটার্ন বা আয়ের হার বেশি থাকায় আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে রিইনস্যুরেন্স খাতটি বেশ চমকপ্রদ ও সুরক্ষিত বিনিয়োগক্ষেত্র হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বৈশ্বিক রাজনৈতিক ও জলবায়ুজনিত ঝুঁকি বৃদ্ধি পেলেও সঠিক কৌশল নির্ধারণ ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় অনড় থাকার ফলেই বৈশ্বিক পুনর্বীমা খাত এক মজবুত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে মুনাফা ধরে রাখতে সক্ষম হচ্ছে।
