বিমা খাতের শেয়ারে ধস: নীতিমালার কঠোরতায় কমলো বাজার দর

ভারতের শেয়ারবাজারে বৃহস্পতিবার বিমা ও বিমা সংশ্লিষ্ট আর্থিক খাতের শেয়ারে বড় ধরনের ধস নেমেছে। বোম্বে স্টক এক্সচেঞ্জে (বিএসই) লেনদেনের শুরুতেই জীবন বিমা কোম্পানি, বিমা ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ব্যাংক এবং নন-ব্যাংকিং ফিন্যান্সিয়াল কোম্পানিগুলোর (এনবিএফসি) শেয়ারের দর সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ পর্যন্ত পড়ে যায়। ভারতীয় বিমা খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিমা কোম্পানির পরিচালন ব্যয় ও কমিশন কাঠামোর ওপর নতুন বিধিনিষেধ আরোপের প্রস্তাব দেওয়ার পর থেকেই বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে, যার জেরে বাজারজুড়ে এই গণ-বিক্রি দেখা দেয়।
ডিজিটাল বিমা প্ল্যাটফর্ম ‘পলিসি বাজার’-এর মূল প্রতিষ্ঠান পিবি ফিনটেকের শেয়ার দর এক লাফে ২০ শতাংশ কমে ১,৫০৯ রুপিতে নেমে আসে এবং দিনভর লোয়ার সার্কিটে আটকে থাকে। ২০২৬ সালের জুনে শেয়ারবাজারে অন্তর্ভুক্ত হওয়া নতুন ফিনটেক কোম্পানি টার্টলমিন্ট ফিনটেক সলিউশনসের শেয়ার দরও ২০ শতাংশ কমে ১০৯.১০ রুপিতে দাঁড়ায়, যা বাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার পর প্রতিষ্ঠানটির সর্বনিম্ন দর। এছাড়া ম্যাক্স ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস, ক্যানারা এইচএসবিসি লাইফ ইন্স্যুরেন্স এবং এলঅ্যান্ডটি ফাইন্যান্সের মতো খাতের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ার দর দিনের লেনদেনে সর্বোচ্চ ১২ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পেয়েছে।
বিমা ব্যবসার সঙ্গে জড়িত দেশের অন্যান্য বড় আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও ব্যাংকিং খাতের ওপরও এই বিক্রির চাপ ছড়িয়ে পড়ে। আইসিআইসিআই প্রুডেনশিয়াল লাইফ ইন্স্যুরেন্স, এইচডিএফসি লাইফ ইন্স্যুরেন্স, চোলামন্ডলম ইনভেস্টমেন্ট অ্যান্ড ফাইন্যান্স, ইনফো এজ, বাজাজ ফাইন্যান্স, অ্যাক্সিস ব্যাংক এবং বাজাজ ফিনসার্ভের শেয়ার মূল্য ৩ শতাংশ থেকে ৮ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। বিমা খাতের এই পতনের প্রভাবে সামগ্রিক পুঁজিবাজারেও মন্দা দেখা যায়। সকাল সাড়ে ৯টায় বিএসই বেঞ্চমার্ক সূচক সেনসেক্স ০.৭৩ শতাংশ বা প্রায় ৫৪৮ পয়েন্ট কমে ৭৪,২৮৪ পয়েন্টে নেমে আসে।
এই বড় ধরনের পতনের পেছনে মূল কারণ হলো ভারতের বিমা খাত নিয়ন্ত্রক সংস্থা ‘ইন্সুরেন্স রেগুলেটরি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অথরিটি অব ইন্ডিয়া’ (ইরডাই)-এর বুধবার প্রকাশিত একটি খসড়া প্রস্তাবনা। এই পরামর্শপত্রে বিমা কোম্পানিগুলোর ব্যবস্থাপনা ব্যয় (ইওএম) পর্যায়ক্রমে কমানোর কথা বলা হয়েছে। নতুন নিয়ম বাস্তবায়িত হলে জীবন বিমা কোম্পানিগুলোকে আগামী দুই বছরের মধ্যে তাদের মোট পরিচালন ব্যয় কমিয়ে গ্রস ডিরেক্ট প্রিমিয়াম ইনকামের (জিডিপিআই) ১৫ শতাংশে আনতে হবে। পরবর্তী পাঁচ বছরের মধ্যে এই ব্যয়ের মাত্রা ১২.৫ শতাংশে নামিয়ে আনার কঠোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
ইরডাই-এর এই খসড়া নীতিমালায় প্রডাক্টভিত্তিক ও চ্যানেলভিত্তিক কমিশনের ওপর নতুন সীমা নির্ধারণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যা বিমা বিতরণ ব্যবস্থার খরচ কাঠামোকে পুরোপুরি বদলে দেবে। ভারতে বিমা বিক্রির জন্য ব্যাংক, ফিনটেক প্ল্যাটফর্ম এবং এনবিএফসিগুলোর ওপর বিমা কোম্পানিগুলো ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। এসব মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠান বিমা প্রডাক্ট বিক্রি করে মোটা অঙ্কের কমিশন আয় করে থাকে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী পরিচালন ব্যয় ও কমিশন ফি কমে গেলে বিমা কোম্পানিগুলোর পাশাপাশি ব্যাংক ও ফিনটেক প্ল্যাটফর্মগুলোর আয় ও মুনাফার ওপর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। কমিশন থেকে আয় কমে যাওয়ার শঙ্কায় প্রাতিষ্ঠানিক ও সাধারণ বিনিয়োগকারীরা তড়িঘড়ি করে শেয়ার বিক্রি শুরু করায় বিমা খাত জুড়েই এই দরপতন তৈরি হয়।
বৃহস্পতিবারের শেয়ারবাজার লেনদেনে ক্ষতিগ্রস্ত শীর্ষ বিমা ও বিমা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর বিস্তারিত তথ্য নিচে তুলে ধরা হলো:
কোম্পানির নামশেয়ারের দরপতন (%)দর বা অবস্থান (₹)প্রতিষ্ঠানের ধরন / খাত
পিবি ফিনটেক (পলিসি বাজার)২০.০০% (লোয়ার সার্কিট)১,৫০৯.০০ফিনটেক ও বিমা এগ্রিগেটর
টার্টলমিন্ট ফিনটেক সলিউশনস২০.০০%১০৯.১০ (সর্বনিম্ন)বিমা ফিনটেক প্ল্যাটফর্ম
ম্যাক্স ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস১২.০০% পর্যন্তলেনদেনকালীন হ্রাসজীবন বিমা হোল্ডিং
ক্যানারা এইচএসবিসি লাইফ১২.০০% পর্যন্তলেনদেনকালীন হ্রাসজীবন বিমা সেবা
এলঅ্যান্ডটি ফাইন্যান্স১২.০০% পর্যন্তলেনদেনকালীন হ্রাসএনবিএফসি ও আর্থিক সেবা
এইচডিএফসি লাইফ ইন্স্যুরেন্স৩.০০% – ৮.০০%লেনদেনকালীন হ্রাসজীবন বিমা সেবা
আইসিআইসিআই প্রুডেনশিয়াল লাইফ৩.০০% – ৮.০০%লেনদেনকালীন হ্রাসজীবন বিমা সেবা
বাজাজ ফিনসার্ভ৩.০০% – ৮.০০%লেনদেনকালীন হ্রাসবিমা ও আর্থিক হোল্ডিং
বাজাজ ফাইন্যান্স৩.০০% – ৮.০০%লেনদেনকালীন হ্রাসএনবিএফসি সেবা
চোলামন্ডলম ইনভেস্টমেন্ট৩.০০% – ৮.০০%লেনদেনকালীন হ্রাসএনবিএফসি ও বিনিয়োগ
অ্যাক্সিস ব্যাংক৩.০০% – ৮.০০%লেনদেনকালীন হ্রাসব্যাংকিং ও বিমা বিতরণ
ইনফো এজ (ইন্ডিয়া)৩.০০% – ৮.০০%লেনদেনকালীন হ্রাসইন্টারনেট ও ফিনটেক বিনিয়োগ
বিএসই সেনসেক্স (সূচক)০.৭৩%৭৪,২৮৪.০০সামগ্রিক শেয়ারবাজার সূচক

মন্তব্য করুন