বীমা-সমর্থিত ঋণ: উন্নয়নশীল দেশের অর্থনীতিতে অর্থায়নের নতুন দিগন্ত

বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতিতে উন্নয়নশীল দেশগুলোর সামনে সবচেয়ে বড় ও উদ্বেগজনক চ্যালেঞ্জ হলো বিশাল অর্থায়ন ঘাটতি। জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) সময়মতো অর্জনের জন্য প্রতিবছর বিশ্বব্যাপী প্রায় ৪ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিপুল বিনিয়োগ প্রয়োজন। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, উন্নয়নশীল দেশগুলোর নিজস্ব সরকারি বাজেট এবং আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থাগুলোর বর্তমান আর্থিক সক্ষমতা এই আকাশচুম্বী চাহিদার তুলনায় অত্যন্ত সামান্য। এই বিশাল অর্থায়ন ঘাটতির প্রত্যক্ষ প্রভাবে এশীয়, আফ্রিকান ও লাতিন আমেরিকার দেশগুলোতে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং জলবায়ু অভিযোজন সংক্রান্ত মেগা প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি মারাত্মকভাবে ব্যাহত ও পিছিয়ে পড়ছে। এই বৈশ্বিক সংকটকালীন পরিস্থিতিতে বিশ্ব আর্থিক ব্যবস্থায় বেসরকারি পুঁজি, বিশেষ করে বীমা খাতের দীর্ঘমেয়াদি বিশাল মূলধনকে কাজে লাগানোর বিষয়টি নতুন করে এবং অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে সামনে এসেছে।

বীমা খাতের বৈশ্বিক সক্ষমতা ও উন্নয়নশীল দেশের বাস্তবতা পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্ব অর্থনীতির বীমা শিল্প এখন দ্রুত সম্প্রসারিত একটি খাত। ধারণা করা হচ্ছে, ২০২৭ সালের মধ্যে বৈশ্বিক বীমা বাজারের আকার প্রায় ৯.৮ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। তবে এই বিপুল পরিমাণ বৈশ্বিক মূলধনের এক-চতুর্থাংশেরও কম (২৫ শতাংশের নিচে) এখন পর্যন্ত উন্নয়নশীল দেশগুলোর বাজারে প্রবেশ বা প্রবাহিত হতে পেরেছে। এর পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে কাজ করছে উন্নয়নশীল দেশগুলোর উচ্চ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ঝুঁকি, দীর্ঘমেয়াদি দায়ের অসামঞ্জস্যতা, দুর্বল ও জটিল নিয়ন্ত্রক কাঠামো এবং আন্তর্জাতিক মানের প্রকল্প প্রস্তুতির চরম সীমাবদ্ধতা। ফলে বিশ্ব পুঁজি বাজারের কাছে এই উদীয়মান অর্থনীতিগুলো এখনো উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।

অর্থায়নের নতুন মডেল: ঝুঁকি-ভিত্তিক ক্রেডিট বীমা এই চরম অর্থায়ন সংকটের মধ্যেই বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থায় একটি অত্যন্ত কার্যকর ও শক্তিশালী ঝুঁকি-ভিত্তিক অর্থায়ন কাঠামো বা মডেল জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। এই অভিনব মডেলে বীমা কোম্পানিগুলো প্রথাগত নিয়মে সরাসরি কোনো প্রকল্পে বিনিয়োগ করে না। এর পরিবর্তে, তারা বহুপাক্ষিক উন্নয়ন ব্যাংকগুলোর (যেমন বিশ্বব্যাংক, এডিবি বা আইএফসি) দেওয়া ঋণের ক্রেডিট ঝুঁকির একটি নির্দিষ্ট অংশ বীমা (গ্যারান্টি) করে থাকে। অর্থাৎ, উন্নয়ন ব্যাংকগুলো যথানিয়মে ঋণ বিতরণ করে, আর বীমা প্রতিষ্ঠানগুলো সেই ঋণের সম্ভাব্য খেলাপি বা ক্ষতির ঝুঁকি নিজেদের কাঁধে ভাগ করে নেয়। কোনো কারণে ঋণ গ্রহীতা দেশ বা প্রতিষ্ঠান ঋণ খেলাপি হলে, বীমা প্রতিষ্ঠান চুক্তি অনুযায়ী নির্দিষ্ট অনুপাতে ক্ষতিপূরণ প্রদান করে। এর ফলে উন্নয়ন ব্যাংকগুলোর মূলধন বহুগুণ বেশি নিরাপদ হয় এবং তারা একই মূলধন ব্যবহার করে পূর্বের তুলনায় অনেক বেশি পরিমাণ নতুন প্রকল্পে অর্থায়ন করতে সক্ষম হয়। আর্থিক খাতের হিসাব অনুযায়ী, এই মডেলে মাত্র ১ ডলারের বীমা সক্ষমতা প্রায় ২ ডলার বা তার চেয়েও বেশি উন্নয়ন ঋণ লেভারেজ বা অতিরিক্ত ঋণ সৃষ্টির সুযোগ তৈরি করছে।

আইএফসি-এর নীরব বিপ্লব ও বাস্তব প্রভাব এই কাঠামোর অন্যতম সফল ও বাস্তবসম্মত উদাহরণ হলো আন্তর্জাতিক অর্থায়ন কর্পোরেশন বা আইএফসি (IFC)-এর বিশেষ উদ্যোগ—’ম্যানেজড কো-ল্যান্ডিং পোর্টফোলিও প্রোগ্রাম ফর ফাইন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউশনস’ (MCPP)। এই বিশেষ প্রোগ্রামের আওতায় বৈশ্বিক বীমা কোম্পানিগুলো উন্নয়নশীল দেশের স্থানীয় আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণ পোর্টফোলিওতে শক্তিশালী ক্রেডিট সুরক্ষা বা বীমা সুবিধা প্রদান করে। এর সুবাদে আইএফসি অত্যন্ত সাহসের সাথে বড় পরিসরে ঋণ সম্প্রসারণের সুযোগ পায়। ২০২৩ সালের একটি আনুষ্ঠানিক খতিয়ান থেকে জানা যায়, এই কাঠামোর মাধ্যমে প্রায় ৩.৫ বিলিয়ন ডলারের ক্রেডিট বীমা সক্ষমতা সংগ্রহ করা সম্ভব হয়েছে, যা আগামী কয়েক বছরের মধ্যে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলারের অতিরিক্ত ঋণ সম্প্রসারণে সরাসরি সহায়তা করবে।

এই যুগান্তকারী অর্থায়নের ইতিবাচক প্রভাব ইতোমধ্যে উন্নয়নশীল দেশগুলোর বাস্তব অর্থনীতি ও তৃণমূল পর্যায়ে পড়তে শুরু করেছে। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, বিশ্বের ৭০টিরও বেশি স্থানীয় আর্থিক প্রতিষ্ঠান এই অভিনব কাঠামোর মাধ্যমে সরাসরি অর্থায়ন লাভ করেছে এবং এর ফলে বিশ্বের অন্তত ২৭টি দেশের বিভিন্ন উৎপাদনশীল প্রকল্পে অর্থের প্রবাহ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক বিষয় হলো, এই ২৭টি দেশের মধ্যে ২৪টি দেশই আন্তর্জাতিকভাবে অত্যন্ত দরিদ্র, ভঙ্গুর ও অর্থনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত। এই মডেলের কল্যাণে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা (এসএমই), নারী উদ্যোক্তা এবং গ্রামীণ কৃষি খাতে প্রাতিষ্ঠানিক অর্থায়ন প্রায় ২০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে, যা স্থানীয় অর্থনীতিতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও দারিদ্র্য বিমোচনে একটি নতুন গতি সঞ্চার করেছে। অনেক অর্থনৈতিক বিশ্লেষক এই পুরো প্রক্রিয়াটিকে বিশ্ব অর্থায়নের ক্ষেত্রে একটি ‘নীরব বিপ্লব’ হিসেবে আখ্যায়িত করছেন।

ঝুঁকি, চ্যালেঞ্জ ও টেকসই ভবিষ্যতের সমীকরণ যদিও এই মডেলটি অত্যন্ত সম্ভাবনাময়, তবুও এটি পুরোপুরি ঝুঁকিমুক্ত নয়। বর্তমান বিশ্ব রাজনীতির অস্থিরতা, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা এবং ক্রমবর্ধমান জলবায়ু সংকট এই নতুন ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কাঠামোর সামনে বড় ধরণের চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিচ্ছে। হঠাৎ যদি বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় কোনো আর্থিক ধাক্কা বা মন্দা আসে, তবে বীমা কোম্পানিগুলোর এই ধরণের উচ্চ ঝুঁকি গ্রহণের সক্ষমতা রাতারাতি কমে যেতে পারে। তাছাড়া, উন্নয়নশীল দেশের দীর্ঘমেয়াদি ও কম মুনাফাসম্পন্ন কিন্তু সামাজিক প্রভাব অনেক বেশি—এমন জনকল্যাণমূলক প্রকল্পে বহুজাতিক বীমা কোম্পানিগুলোর বাণিজ্যিক আগ্রহ কতদিন টিকে থাকবে, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মনে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। মূলত ‘উন্নয়ন’ বনাম ‘মুনাফা’—এই দুইয়ের মধ্যকার দ্বন্দ্বই এখন পুরো ব্যবস্থার কেন্দ্রে অবস্থান করছে।

একই সাথে বর্তমান বিশ্বে জলবায়ু অর্থায়নের বার্ষিক প্রয়োজন প্রায় ১ থেকে ২ ট্রিলিয়ন ডলার, যা এই মডেলের গুরুত্বকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। বর্তমানে উন্নয়নশীল দেশগুলোর অনেক প্রত্যন্ত অঞ্চলে সাধারণ মানুষের আর্থিক অন্তর্ভুক্তির হার এখনো ৫০ শতাংশের নিচে। এমতাবস্থায় এই ধরণের ক্রেডিট বীমা ব্যবস্থা প্রাতিষ্ঠানিক পুঁজির সাথে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর একটি শক্তিশালী সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করতে পারে। তবে এর জন্য বিদ্যমান আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রক জটিলতা এবং নীতিগত বাধাগুলো দ্রুত দূর করা প্রয়োজন।

পরিশেষে বলা যায়, বীমা-সমর্থিত এই ঋণ ব্যবস্থা এখন আর কেবল সাধারণ কোনো আর্থিক উদ্ভাবন নয়, বরং এটি বৈশ্বিক উন্নয়ন অর্থায়নের ক্ষেত্রে একটি স্থায়ী ও কাঠামোগত পরিবর্তন। আগামী এক দশকে যদি এই মডেলটিকে বৈশ্বিকভাবে আরও বিস্তৃত করা যায় এবং যথাযথ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, দেশীয় নীতিগত সমন্বয় ও দীর্ঘমেয়াদি টেকসই রিটার্ন নিশ্চিত করা সম্ভব হয়, তবে উন্নয়নশীল দেশগুলোর অবকাঠামো, পরিবেশবান্ধব জলবায়ু প্রকল্প এবং এসএমই খাতের অর্থায়নে এক অভূতপূর্ব ও বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধিত হবে।

মন্তব্য করুন