বিশ্ব অর্থনীতিতে নানা অনিশ্চয়তা এবং সার্বিক প্রবৃদ্ধির শ্লথগতি সত্ত্বেও ২০২৬ সালে বৈশ্বিক গড়ের চেয়ে অনেক বেশি গতিতে বিকশিত হচ্ছে এশিয়ার বীমা বাজার। আন্তর্জাতিক পুনর্বীমা খাতের শীর্ষ গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘সুইস রে ইনস্টিটিউট’ (Swiss Re Institute)-এর সাম্প্রতিক এক বৈশ্বিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছর বিশ্বব্যাপী প্রকৃত বীমা প্রিমিয়াম প্রবৃদ্ধি হ্রাস পেয়ে মাত্র ১.৩ শতাংশে নেমে আসার আশঙ্কা রয়েছে। তবে এই বৈশ্বিক মন্দা ও শ্লথগতির বিপরীতে দাঁড়িয়ে বিশ্বের শীর্ষ ২০টি প্রধান বীমা বাজারের মধ্যে সর্বোচ্চ ৭.১ শতাংশ প্রকৃত প্রবৃদ্ধি অর্জন করে এককভাবে শীর্ষস্থানে রয়েছে ভারত।
এশীয় অঞ্চলের এই অভাবনীয় অগ্রগতির পেছনে মূল চালিকাশক্তি হিসেবে ভূমিকা রাখছে ভারত ও চীনের লাইফ বা জীবন বীমা খাতের জোরালো চাহিদা।
Table of Contents
এশিয়ার দুই অর্থনৈতিক পরাশক্তি: ভারত ও চীনের বর্তমান চিত্র
ভারতের কর কাঠামো ও জাতীয় বীমা নিয়ন্ত্রক সংস্থার (IRDAI) সময়োপযোগী নীতিগত সংস্কারের ফলে ২০২৬ সালে দেশটির লাইফ ইন্স্যুরেন্স প্রিমিয়াম প্রায় ৭ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে নাগরিকদের মাঝে স্বাস্থ্য বীমার ঊর্ধ্বমুখী চাহিদা এবং মোটর যানবাহনের ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি দেশের নন-লাইফ বা সাধারণ বীমা খাতকে অভূতপূর্ব গতি ও স্থায়িত্ব এনে দিয়েছে।
অন্যদিকে, চীনের লাইফ ইন্স্যুরেন্স বাজার ২০২৬ সালে ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারে, যা ২০২৫ সালের ৯.৪ শতাংশের তুলনায় কিছুটা ধীরগতির। মেয়াদের পর বাণিজ্যিক ব্যাংকিং আমানত পরিপক্ক হওয়া এবং নতুন ও আকর্ষণীয় সঞ্চয়ভিত্তিক পণ্যের সুবিধার কারণে দেশটিতে জীবন বীমার চাহিদা স্থিতিশীল রয়েছে। তবে অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক শ্লথগতি এবং ভোক্তাদের মানসিক আস্থা কিছুটা হ্রাসের কারণে তাদের সাধারণ বীমা প্রবৃদ্ধি আগের বছরের ৩.৭ শতাংশ থেকে কমে ২.৯ শতাংশে নামতে পারে।
এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের বীমা বাজারের সার্বিক চিত্র
মহাদেশের উন্নত এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে লাইফ ইন্স্যুরেন্স প্রিমিয়াম প্রবৃদ্ধি ২০২৫ সালের ৮.৪ শতাংশ থেকে কমে ২০২৬ সালে ২.৫ শতাংশে দাঁড়াবে। এর মধ্যে জাপানে অত্যন্ত নামমাত্র ০.৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি দেখা যেতে পারে, কারণ দেশটির জনসংখ্যা দ্রুত হ্রাস পাওয়া এবং বার্ধক্য বৃদ্ধির কারণে ঐতিহ্যবাহী জীবন বীমার চাহিদা অনেকটাই থমকে গেছে।
অস্ট্রেলিয়ায় জীবন বীমা প্রবৃদ্ধি আনুমানিক ০.৭ শতাংশ হতে পারে। সেখানে সাম্প্রতিক প্রাকৃতিক দুর্যোগে সম্পত্তির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির পর নতুন করে ইন্স্যুরেন্স প্রিমিয়াম রেট পুনর্নির্ধারণ করার ফলে প্রবৃদ্ধিতে ইতিবাচক সাড়া দেখা যাচ্ছে। যদিও স্থানীয় উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার খরচ বৃদ্ধি সেই প্রভাবকে কিছুটা সামাল দিচ্ছে।
এআই, সেমিকন্ডাক্টর ও ডেটা সেন্টারের নতুন প্রযুক্তিগত ঝুঁকি
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) প্রযুক্তিতে বিশ্বজুড়ে যে বিপুল বিনিয়োগের জোয়ার এসেছে, তা এশিয়াজুড়ে বিশেষায়িত বাণিজ্যিক বীমার এক নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে। গত বছরের তুলনায় এশীয় অঞ্চলের সেমিকন্ডাক্টর রপ্তানি এক লাফে ৭৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যার মূল সুবিধা পেয়েছে তাইওয়ান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো প্রযুক্তিবিদ দেশগুলো। এর পাশাপাশি সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়া দ্রুত বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর হাব ও ডেটা সেন্টারের নতুন ঠিকানা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে।
ঝুঁকির নতুন মাত্রা: বিশালাকার এসব ডেটা সেন্টার এবং সেগুলোর পাওয়ার ইনফ্রাস্ট্রাকচার এক নির্দিষ্ট স্থানে কেন্দ্রীভূত থাকার ফলে বড় ধরনের বীমা ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এ কারণে প্রপার্টি, ইঞ্জিনিয়ারিং, লায়াবিলিটি, সাইবার সিকিউরিটি এবং বিজনেস ইন্টারাপশন (ব্যবসায়িক স্থবিরতা) সংক্রান্ত বিশেষায়িত বীমা কাভারেজের চাহিদা আন্তর্জাতিক বাজারে বহুগুণ বৃদ্ধি পাচ্ছে।
আন্তর্জাতিক সুদের হার ও বিশ্ব সাপ্লাই চেইনের চ্যালেঞ্জ
বিশ্ববাজারে উচ্চ সুদের হার বজায় থাকায় এশিয়ার লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিগুলোর বিনিয়োগ থেকে প্রাপ্ত আয় কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে একই সময়ে ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ও আন্তর্জাতিক সরবরাহ শৃঙ্খল (Supply chain) মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এতে যানবাহন মেরামত, নতুন অবকাঠামো নির্মাণ এবং সম্পত্তির ক্ষতিপূরণ সংক্রান্ত বীমা দাবি (Claims) মিটাতে প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালন খরচ অনেক বেড়ে গেছে। বিশেষ করে যেসব দেশ আন্তর্জাতিক জ্বালানি আমদানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল, তাদের অ-জীবন বা সাধারণ বীমা খাতের ব্যবসায়িক লাভজনকতায় এটি চরম নেতিবাচক চাপ সৃষ্টি করছে।
