জাপানের জীবন বীমা খাত গত তিন দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় নীতিগত পরিবর্তনের মুখমুখী হয়েছে। দেশটির জন্মহার আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়া এবং দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়া বার্ধক্যগ্রস্ত জনসংখ্যার কারণে স্থানীয় বাজারে ব্যবসার প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই স্থবিরতা কাটাতে জাপানি জীবন বীমা প্রতিষ্ঠানগুলো বিশ্ববাজারে সরাসরি বিনিয়োগ বাড়ানো এবং পুনর্বীমার (Reinsurance) ওপর নির্ভরতা লক্ষণীয়ভাবে বৃদ্ধি করার পথ বেছে নিয়েছে। তবে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার নতুন ব্যবস্থার মাঝে এই কৌশল কতটা টেকসই হবে, তা নিয়ে অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকদের মধ্যে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে।
গবেষণা ও ক্রেডিট রেটিং সংস্থা ক্রেডিটসাইটস (CreditSights) তাদের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে জানিয়েছে, অভ্যন্তরীণ বাজারে ব্যবসা সম্প্রসারণের পথ সংকুচিত হলেও জাপানের জীবন বীমা খাতের মূলধন ভিত্তি এখনো যথেষ্ট মজবুত। পরিবর্তিত পরিস্থিতির সাথে মানিয়ে নিতেই বীমা প্রতিষ্ঠানগুলো ক্রমাগত আন্তর্জাতিক বাজারের দিকে অগ্রসর হচ্ছে।
জাপানের প্রধান আর্থিক নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস এজেন্সির (FSA) প্রবর্তিত মানদণ্ড ‘জাপান ইন্স্যুরেন্স ক্যাপিটাল স্ট্যান্ডার্ড’ (J-ICS) কার্যকর করার প্রক্রিয়ার পর থেকেই মূলত এই পরিবর্তন ত্বরান্বিত হয়েছে। এই নতুন কাঠামোটি বাজারের গতিপ্রকৃতির প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল—বিশেষ করে সুদের হারের তারতম্য, গ্রাহকদের পলিসি বাতিলের প্রবণতা, সম্পদ ও দায়ের ভেতরের অসমতা (ALM mismatch) এবং দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য ও জীবন বীমার ঝুঁকিকে এটি গুরুত্বের সাথে মূল্যায়ন করে। ফলে নিজস্ব মূলধন সুরক্ষিত রাখতে প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের ঝুঁকির একটি অংশ পুনর্বীমা কোম্পানির কাছে হস্তান্তর করতে বাধ্য হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক রেটিং সংস্থা এ.এম. বেস্টের (A.M. Best) উপাত্ত পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, নতুন কাঠামোর প্রভাবে পুনর্বীমা ব্যবহারের চিত্রে বড় পরিবর্তন এসেছে:
প্রিমিয়াম হস্তান্তরের হার: ২০২০ সালে অর্জিত মোট প্রিমিয়ামের ১০ শতাংশেরও কম অংশ পুনর্বীমা করা হতো, যা ২০২৩ ও ২০২৪ সাল নাগাদ একলাফে ২৪ শতাংশ অতিক্রম করেছে।
মূলধনী অনুপাতের বৃদ্ধি: বীমা খাতের মোট মূলধন ও উদ্বৃত্তের (Capital and Surplus) সাপেক্ষে হস্তান্তরিত পুনর্বীমার হার ২০২০ সালের ৪.৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৪ সাল শেষে ১৪.৮ শতাংশে পৌঁছেছে।
শীর্ষ প্রতিষ্ঠানের চিত্র: ডাই-ইচি ফ্রন্টিয়ার লাইফ, প্রুডেন্সিয়াল জিব্রাল্টার ফিন্যান্সিয়াল এবং মেটলাইফ ইন্স্যুরেন্সের মতো বড় বীমা কোম্পানিগুলোতে ২০২৪ সালে এই অনুপাত ৫০০ শতাংশও ছাড়িয়ে যায়।
তবে এই উচ্চ হারের পুনর্বীমার মধ্যেও ইতিবাচক একটি দিক হলো—সার্বিক বিচারে জাপানের ব্যক্তিক জীবন বীমা ও অ্যানুইটি পলিসির মাত্র ১ থেকে ২ শতাংশ সরাসরি পুনর্বীমা চুক্তির আওতায় এসেছে। ফলে পুরো বীমা বাজারের ওপর তাৎক্ষণিক বড় কোনো আর্থিক বিপর্যয়ের ঝুঁকি কিছুটা কম।
পুনর্বীমার মাধ্যমে মূলধনের আইনি বাধ্যবাধকতা ও চাপ কমানো গেলেও এতে নতুন করে ‘কাউন্টারপার্টি রিস্ক’ বা তৃতীয় পক্ষ খেলাপির ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে কোনো বিদেশি অফশোর পুনর্বীমা প্রতিষ্ঠান যদি সময়মতো দাবি মেটাতে না পারে, তবে সেই আর্থিক দায়ের পুরো ভার আবার মূল বীমা কোম্পানির ওপরেই এসে পড়বে। এই সম্ভাব্য সংকট এড়াতে জাপানের এফএসএ (FSA) এখন অফশোর পুনর্বীমা চুক্তি, প্রাইভেট ইকুইটি ফার্মগুলোর ভূমিকা ও সীমান্ত পারাপারের জামানত সুরক্ষায় কড়া নজরদারি শুরু করেছে।
নতুন J-ICS ব্যবস্থার অধীনে বীমা কোম্পানিগুলোর সলভেন্সি রেশিও বা দায় পরিশোধের অনুপাত কাগজ-কলমে কিছুটা নিম্নমুখী দেখালেও বড় কোম্পানিগুলো এখনো নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্ধারিত সর্বনিম্ন ১০০ শতাংশের সীমা সফলভাবেই ধরে রেখেছে। পাশাপাশি, সুদের হার বাড়ায় বন্ড পোর্টফোলিওতে কিছু সাময়িক অনাদায়ী ক্ষতি দৃশ্যমান হলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি সম্পদ পুনর্বিনয়োগের ক্ষেত্রে ভালো মুনাফা এনে দেবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
