‘ক্যানসার আক্রান্ত’ ১৩ জীবন বিমা কোম্পানি: সংকটে দেশের বিমা খাত

দেশের সামগ্রিক জীবন বিমা খাতে ব্যবসার পরিসর বাড়লেও এর ভেতরে লুকিয়ে রয়েছে এক গভীর ও উদ্বেগজনক আর্থিক সংকট। ২০২০ থেকে ২০২৫ সালের তুলনামূলক তথ্য বিশ্লেಷণে দেখা যায়, এই খাতের ১৩টি গুরুত্বপূর্ণ কোম্পানির ব্যবসা ও জীবন তহবিল উভয় ক্ষেত্রেই ভয়াবহ পতন ঘটেছে। দীর্ঘ সময় ধরে ব্যবসা সংকুচিত হওয়া এবং গ্রাহকদের দীর্ঘমেয়াদি আমানত তথা জীবন তহবিল আশঙ্কাজনক হারে কমে যাওয়ার এই অবস্থাকে ‘ক্যানসার আক্রান্ত’ হিসেবে আখ্যায়িত করছেন খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, শুরুতেই এই রোগের সঠিক চিকিৎসা বা প্রতিকার না করা হলে এর নেতিবাচক প্রভাব পুরো অর্থনীতির ওপর পড়তে পারে।
সংকটগ্রস্ত কোম্পানিগুলোর বর্তমান চিত্র
আলোচ্য তালিকায় থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ, পদ্মা ইসলামী লাইফ, গোল্ডেন লাইফ, বায়রা লাইফ, মেঘনা লাইফ, পপুলার লাইফ, রূপালী লাইফ, প্রাইম ইসলামী লাইফ, হোমল্যান্ড লাইফ, সানফ্লাওয়ার লাইফ, সান লাইফ, প্রগ্রেসিভ লাইফ এবং প্রটেক্টিভ লাইফ ইন্স্যুরেন্স। বিগত ছয় বছরের ব্যবধানে এসব প্রতিষ্ঠানের বেশিরভাগেরই প্রিমিয়াম আয় এবং লাইফ ফান্ড তলানিতে ঠেকেছে। উদাহরণস্বরূপ, মেঘনা লাইফের ব্যবসা ৪২২ কোটি থেকে কমে ২৮৩ কোটি টাকায় নেমেছে এবং জীবন তহবিল কমেছে ৩২০ কোটি টাকা। একইভাবে ফারইস্ট লাইফের জীবন তহবিল ইতিবাচক অবস্থা থেকে সম্পূর্ণ ঋণাত্মক ৮৪৭ কোটি টাকায় এসে ঠেকেছে। পদ্মা লাইফের অবস্থাও তদ্রূপ, যেখানে জীবন তহবিল ঋণাত্মক ৩০৯ কোটি টাকায় নেমে এসেছে।
বিমা খাতে ব্যবসা ও জীবন তহবিলের তুলনামূলক পরিসংখ্যান
বিমা কোম্পানির নাম২০২০ সালের ব্যবসা (কোটি টাকা)২০২৫ সালের ব্যবসা (কোটি টাকা)২০২০ সালের জীবন তহবিল (কোটি টাকা)২০২৫ সালের জীবন তহবিল (কোটি টাকা)
ফারইস্ট ইসলামী লাইফ৯৭৪২৮৩২,০০৩ঋণাত্মক ৮৪৭
পদ্মা ইসলামী লাইফ৪৯১৫১৩ঋণাত্মক ৩০৯
মেঘনা লাইফ৪২২২৮৩১,৮৯০১,৫৭০
পপুলার লাইফ৫৯১৫০১১,৭৫২১,৪৯২
প্রাইম ইসলামী লাইফ৪১৪৩৮৮৮৩৭৭৪৪
হোমল্যান্ড লাইফ১০১৯২৬১১৬৮
সানফ্লাওয়ার লাইফ৬৫১৫১৩৮৮৮
প্রগ্রেসিভ লাইফ৪২৩০২৭৩৬৯
সান লাইফ১০৫১৯১৮২৪৯
প্রটেক্টিভ লাইফ৩৯৩১১০১
সংকটের পেছনের মূল কারণসমূহ
বিশ্লেষকদের মতে, এই সংকট একদিনে তৈরি হয়নি। বিগত বছরগুলোতে বিভিন্ন জীবন বিমা কোম্পানির তহবিল থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ লুটপাট, অপরিকল্পিত ও বিলাসবহুল ব্যয় এবং রাজনৈতিক বিবেচনায় লাইসেন্স প্রদান এর জন্য প্রধানত দায়ী। কোম্পানির শীর্ষ কর্তারা অতীতে অতিরিক্ত গাড়ি কেনা বা বড় বড় প্রকল্প হাতে নিয়ে ভবিষ্যতের দায়ের কথা বিবেচনা করেননি। এর ফলে বর্তমান সময়ে যখন পলিসির মেয়াদ শেষ হচ্ছে, তখন গ্রাহকদের দাবি পরিশোধ করার মতো পর্যাপ্ত অর্থ তাদের হাতে থাকছে না।
তাছাড়া, ব্যাংক ও বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানে কোম্পানির শত শত কোটি টাকা আটকে থাকাও এই সংকটের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। তবে একই সময়ে ন্যাশনাল লাইফ, ডেল্টা লাইফ, সোনালী লাইফ ও গার্ডিয়ান লাইফের মতো কিছু প্রতিষ্ঠান নিয়মতান্ত্রিকভাবে ব্যবসা সফলভাবে পরিচালনা করে নিজেদের অবস্থান শক্ত করে চলেছে। তাই সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকে দায়ী না করে নিজস্ব সুশাসনের অভাবকেই দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। বিমা খাতকে এই মারাত্মক বিপর্যয় থেকে রক্ষা করতে অবিলম্বে কঠোর তদারকি, অনিয়মের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং সুনির্দিষ্ট সংস্কারমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি হয়ে পড়েছে।

মন্তব্য করুন