কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির দ্রুতগতির প্রসারের কারণে বিশ্বজুড়ে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ডেটা সেন্টারের শক্তি ও সক্ষমতার চাহিদা অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে। আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি গবেষণা ও বিমা খাতের পরিসংখ্যান বলছে, ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী ডেটা সেন্টারগুলোর বিদ্যুৎ ব্যবহারের হার প্রায় ১৬৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেতে পারে। ফলে সার্বিক বিদ্যুৎ চাহিদা আগের তুলনায় প্রায় তিনগুণে গিয়ে ঠেকবে। এই প্রযুক্তিগত অগ্রগতির পেছনে দেখা দিয়েছে জটিল কিছু অবকাঠামোগত ও পরিবেশগত ঝুঁকি। অতিরিক্ত চাপগ্রস্ত জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিড, চরম প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং অভ্যন্তরীণ প্রযুক্তিগত বিকলতার কারণে বৈশ্বিক বিমা কোম্পানিগুলো এখন তাদের নীতি ও বিমা কাভারেজের শর্ত পুনর্নির্ধারণ করতে বাধ্য হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক বিমা সেবা প্রদানকারী সংস্থা এওন পিএলসির (Aon Plc) এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের বাণিজ্যিক ঝুঁকি বিভাগের প্রধান টেরেন্স উইলিয়ামস জানান, হাইপারস্কেল ডেটা সেন্টার গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সার্বক্ষণিক বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। মূল বিদ্যুৎ গ্রিডের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমাতে বর্তমানে বহু ডেভেলপার নিজেদের উদ্যোগে বিকল্প বিদ্যুৎ কেন্দ্র, মাইক্রোগ্রিড, হাইব্রিড শক্তি এবং উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ব্যাটারি স্টোরেজ ব্যাকআপ ব্যবস্থা গড়ে তুলছেন।
তবে নিজস্ব এসব বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা অবকাঠামোর কারণে অগ্নিকাণ্ড, উচ্চমূল্যের সেনসিটিভ সরঞ্জামের চরম গোলযোগ এবং জটিল রক্ষণাবেক্ষণ সংকটের মতো নতুন নতুন ঝুঁকির সৃষ্টি হচ্ছে। এআই প্রসেসিংয়ের কাজ সম্পাদনে প্রসেসরের কাজের মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় প্রতিটি সার্ভার র্যাকে বিদ্যুৎ খরচের ঘনত্ব এবং তাপ উৎপাদন বিপজ্জনক হারে বেড়েছে। এতে করে কার্যকর কুলিং বা শীতলীকরণ প্রক্রিয়ার স্বাভাবিক কার্যক্রমও ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ছে। এসব জটিল ও বহুমুখী ঝুঁকি কাভার করতে এওন পিএলসি তাদের ‘ডেটা সেন্টার লাইফসাইকেল ইন্স্যুরেন্স প্রোগ্রাম’-এর বীমা কাভারেজ সীমা ৩.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার থেকে বাড়িয়ে ৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করেছে। এই বিশেষ বিমা প্রোগ্রামের আওতায় ভবনের নকশা অনুমোদন ও নির্মাণকাজ থেকে শুরু করে সার্বিক অপারেশন পরিচালনা পর্যন্ত সব পর্যায় অত্যন্ত কড়া নজরদারিতে রাখা হচ্ছে।
অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাবও আধুনিক এসব অবকাঠামোর নিরাপত্তায় বড় হুমকি তৈরি করছে। আন্তর্জাতিক বিমা প্রতিষ্ঠান এইচডিআই গ্লোবাল এসই (HDI Global SE)-এর সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশেষ করে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে চরম আবহাওয়ার কারণে ডেটা সেন্টারের ভৌগোলিক অবস্থান ও নির্মাণ কৌশল পুরোপুরি বদলে যাচ্ছে।
যেমন, জাপানের টোকিও শহরের মতো প্রধান প্রযুক্তি কেন্দ্রে ভূকম্পন, আকস্মিক বন্যা এবং ঘণ্টায় প্রায় ২০০ কিলোমিটার বেগের শক্তিশালী টাইফুনের ঝুঁকি বিদ্যমান। আবার জলবায়ুর দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৮ি১ থেকে ২১০০ সালের মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার মুম্বাই এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সিঙ্গাপুরের মতো আন্তর্জাতিক প্রযুক্তিকেন্দ্রে বছরের ২০০ দিনেরও বেশি সময় তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে থাকার চরম ঝুঁকি রয়েছে।
সাধারণ বাণিজ্যিক ভবনের চিরাচরিত অবকাঠামো দিয়ে অত্যন্ত দামি ও স্পর্শকাতর প্রসেসিং প্রযুক্তি সুরক্ষিত রাখা সম্ভব নয়। এজন্য নদীভাঙন, দাবানল ও ভূকম্পনপ্রবণ এলাকা এড়িয়ে নতুন স্থাপনা গড়ার তাগিদ দিচ্ছেন বিমা বিশেষজ্ঞরা। সেই সাথে পানি জমা রোধে জরুরি ড্রেনেজ, উঁচু মেঝে এবং যন্ত্রাংশগুলো মেঝের বেশ কিছুটা উঁচুতে বসানোর মতো সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা নেওয়া বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। বড় শহরগুলোতে জমি ও বিদ্যুতের ঘাটতি থাকায় ডেটা সেন্টার পরিচালনাকারীরা এখন দ্বিতীয় বা তৃতীয় সারির শহরগুলোর দিকে নজর দিচ্ছেন। আর তাই বিমা চুক্তি চূড়ান্ত করার আগে পর্যাপ্ত পানির উৎস, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ এবং আপৎকালীন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা শতভাগ নিশ্চিত করা বিমা প্রতিষ্ঠানগুলোর অন্যতম পূর্বশর্তে পরিণত হয়েছে।
