এশিয়ায় বাড়ছে মূল্যস্ফীতির চাপ: দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক পরিকল্পনায় চরম উদাসীনতা

এশিয়ার দেশগুলোতে মূল্যস্ফীতির পারদ যত ওপরে উঠছে, সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন বাজেট ততটাই সংকুচিত হচ্ছে। বর্তমানের নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ মেটাতে গিয়ে মহাদেশটির সিংহভাগ পরিবার তাদের ভবিষ্যৎ বা দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক লক্ষ্যগুলো থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। সম্প্রতি প্রকাশিত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিবেদনে এই উদ্বেগের চিত্রটি ফুটে উঠেছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, এশিয়ার অর্ধেকেরও বেশি মানুষ এক বছরের বেশি সময়ের কোনো আর্থিক ব্যবস্থাপনাই মাথায় রাখছেন না। এর ফলে পরিবারগুলো কোনো আকস্মিক আর্থিক ধাক্কা বা অবসরের পরবর্তী জীবন সামলানোর ক্ষেত্রে কতটা প্রস্তুত, তা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

কানাডাভিত্তিক বহুজাতিক আর্থিক সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান ‘সান লাইফ ফাইন্যান্সিয়াল ইনকর্পোরেটেড’ (সান লাইফ এশিয়া)-এর জুন মাসের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, এশিয়ার প্রায় ৫৫ শতাংশ পরিবারের কোনো দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক পরিকল্পনা নেই। তারা হয় কোনো পরিকল্পনাই করেন না, অথবা বড়জোর আগামী এক বছরের হিসাব কষে দিন পার করছেন। সান লাইফ এশিয়ার প্রধান ক্লায়েন্ট এবং ডিস্ট্রিবিউশন অফিসার ডেভিড ব্রুম এই বিষয়ে জানান, জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় মানুষকে তাদের অর্থ ব্যবস্থাপনার পদ্ধতি নতুন করে ভাবাতে বাধ্য করছে। খাদ্য, জ্বালানি এবং গৃহস্থালির ইউটিলিটি বিলের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি মানুষের দৈনন্দিন বাজেটের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করেছে।

চলতি বছরের আন্তর্জাতিক জরিপ দুটির প্রধান প্রধান অর্থনৈতিক সূচক ও পরিসংখ্যানগুলো নিচে একনজরে দেখে নেওয়া যাক:

এশীয় পরিবারগুলোর বর্তমান আর্থিক চিত্র ও জরিপের মূল ১০টি পরিসংখ্যান

ক্র. নংজরিপের প্রধান সূচক ও বিবরণপরিসংখ্যান ও হারের চিত্র
১এক বছর বা তার কম মেয়াদি আর্থিক পরিকল্পনা (এশিয়া)৫৫% পরিবারের (সান লাইফ রিপোর্ট)
২মূল্যস্ফীতির কারণে মাসিক খরচ চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন৮৩% উত্তরদাতা
৩আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী বা স্থিতিস্থাপক পরিবারের হার (চলতি বছর)২৫% (গত বছর ছিল ৩২%)
৪আর্থিক অবস্থা নিয়ে সম্পূর্ণ নিরাপদ বোধ করছেনমাত্র ১৩% (গত বছর ছিল ১৯%)
৫আয় বন্ধ হলে বাইরের সাহায্য ছাড়া সর্বোচ্চ ৬ মাস টিকবেন৬১% পরিবার
৬দৈনন্দিন খরচ মেটাতে সঞ্চয় ভাঙছেন২৫% মানুষ (প্রতি ৪ জনে ১ জন)
৭অতি প্রয়োজনীয় বা মৌলিক ব্যয় কাটছাঁট করছেন২৭% উত্তরদাতা
৮অবসরের সঞ্চয় বা পেনশনে টাকা দেওয়া বন্ধ করেছেন১০% মানুষ
৯भारतीय কর্মজীবী নারীদের নিজস্ব আর্থিক আত্মবিশ্বাসের স্কোর৮৪ (১০০-এর মধ্যে, এইচডিএফসি লাইফ)
১০भारतीय কর্মজীবী নারীদের প্রকৃত আর্থিক প্রস্তুতির পরিমাপ৫৮ (১০০-এর মধ্যে, এইচডিএফসি লাইফ)

এই স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনার কারণে পরিবারগুলোর হঠাৎ কোনো বড় বিপদে টিকে থাকার ক্ষমতা মারাত্মকভাবে হ্রাস পাচ্ছে। জরিপে অংশ নেওয়া প্রায় ৬১ শতাংশ মানুষ স্বীকার করেছেন, হঠাৎ অসুস্থতা কিংবা চাকরিচ্যুতির কারণে যদি তাদের নিয়মিত আয় বন্ধ হয়ে যায়, তবে বাইরের আর্থিক সাহায্য ছাড়া তারা বড়জোর Corporate বা ব্যক্তিগতভাবে ছয় মাস টিকে থাকতে পারবেন। টিকে থাকার লড়াইয়ে অনেকেই নিজেদের জীবনযাত্রায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনছেন। প্রতি চারজন উত্তরদাতার মধ্যে একজন তাদের সঞ্চয় ভেঙে নিত্যদিনের খরচ চালাচ্ছেন, ২৭ শতাংশ মানুষ তাদের অতি প্রয়োজনীয় ব্যয় কাটছাঁট করতে বাধ্য হয়েছেন এবং ১০ শতাংশ মানুষ অবসরের জন্য সঞ্চয় করা বা পেনশন ফান্ডে টাকা জমা দেওয়া সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়েছেন।

আর্থিক ভবিষ্যতের এই করুণ চিত্র কেবল সান লাইফের প্রতিবেদনে সীমাবদ্ধ নয়। ভারতের স্বনামধন্য বিমা প্রতিষ্ঠান ‘এইচডিএফসি লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড’-এর জুন মাসের আরেকটি গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষের আত্মবিশ্বাস সবসময় বাস্তব প্রস্তুতির সঙ্গে মেলে না। বিশেষ করে কর্মজীবী নারীদের ক্ষেত্রে এই অমিল সবচেয়ে বেশি স্পষ্ট। জরিপে অংশ নেওয়া কর্মজীবী নারীরা তাদের নিজেদের আর্থিক সচেতনতা ও সক্ষমতার মান ১০০-এর মধ্যে ৮৪ দিলেও, বাস্তবে তাদের প্রকৃত আর্থিক প্রস্তুতি ছিল মাত্র ৫৮।

এইচডিএফসি লাইফের নির্বাহী পরিচালক ও প্রধান ব্যবসায়িক কর্মকর্তা বিনীত অরোরা জানান, পরিবারে কর্মজীবী নারীদের অবদান কেবল আয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং তাদের দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক নিরাপত্তা এবং স্বাধীন অবসরের জন্য এখন থেকেই সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা করা জরুরি। কারণ, দেখা গেছে নারীরা সন্তানের শিক্ষা বা বাড়ি কেনার জন্য সঞ্চয় করলেও, অর্ধেকেরও কম নারী তাদের নিজেদের অবসরের জন্য আর্থিক প্রস্তুতি রাখছেন।

অবশ্য এই সংকটের মধ্যেও একটি ইতিবাচক দিক খুঁজে পেয়েছে সান লাইফ এশিয়া। তাদের গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব পরিবারের মধ্যে মৌলিক আর্থিক সাক্ষরতা (Financial Literacy) বা অর্থ ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত জ্ঞান রয়েছে, তারা অন্যদের চেয়ে অনেক বেশি স্থিতিশীল। আর্থিক বিষয়ে সচেতন পরিবারগুলোর মধ্যে মানসিক চাপ কম, ভবিষ্যৎ নিয়ে আত্মবিশ্বাস বেশি এবং যেকোনো সংকট মোকাবিলার দৃষ্টিভঙ্গিও অনেক ইতিবাচক। তাই বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এশিয়ার পরিবারগুলোকে ভবিষ্যতের বড় বিপর্যয় থেকে বাঁচাতে এখনই সঞ্চয়ের মানসিকতা ও সঠিক আর্থিক পরিকল্পনার অভ্যাস গড়ে তোলা প্রয়োজন।

মন্তব্য করুন