ক্যালিফোর্নিয়ায় গাড়িচালকদের ব্যক্তিগত তথ্যের বিনিময়ে বিমা ছাড়ের প্রস্তাব: বিতর্ক তুঙ্গে

ক্যালিফোর্নিয়ার দীর্ঘদিনের মোটরযান বিমা আইনে বড় ধরনের পরিবর্তনের আভাস দিয়ে একটি নতুন বিল ঘিরে রাজ্য রাজনীতি এবং গ্রাহক অধিকার মহলে তুমুল বিতর্ক শুরু হয়েছে। ‘অ্যাসেম্বলি বিল ৩১১’ (AB 311) নামের এই প্রস্তাবিত আইনের মূল বিষয় হলো—গাড়িচালকরা যদি তাদের গাড়ি চালানোর রিয়েল-টাইম বা তাৎক্ষণিক তথ্য বিমা কোম্পানিগুলোকে দিতে রাজি হন, তবে তাদের বিমা প্রিমিয়ামে বিশেষ ছাড় দেওয়া হতে পারে। তবে এই উদ্যোগের তীব্র বিরোধিতা করেছে রাজ্যের বিমা বিভাগ, গ্রাহক স্বার্থ রক্ষা কমিটি এবং প্রাইভেসী বা ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বিষয়ক কর্মীরা।

প্রস্তাবিত এই বিলে ‘টেলিম্যাটিক্স’ প্রযুক্তির ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। এটি এমন এক প্রযুক্তি যা স্মার্টফোন অ্যাপ বা গাড়িতে থাকা বিশেষ ডিভাইসের মাধ্যমে চালকের গতি, ব্রেক করার ধরন, গাড়ি ঘোরানোর তীব্রতা এবং অবস্থানের মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল তথ্য সরাসরি বিমা কোম্পানির কাছে পাঠিয়ে দেয়। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের একমাত্র রাজ্য হিসেবে ক্যালিফোর্নিয়ায় বিমার হার নির্ধারণে এই প্রযুক্তির ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। রাজ্যের প্রচলিত আইন অনুযায়ী, বিমার প্রিমিয়াম নির্ধারণের ক্ষেত্রে চালকের অতীত নিরাপদ ড্রাইভিং রেকর্ড, বছরে মোট কত মাইল গাড়ি চালানো হয়েছে এবং ড্রাইভিংয়ের অভিজ্ঞতাকে প্রধান যোগ্যতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। নতুন বিলটি পাস হলে চালকরা ডিএমভি (DMV) রেকর্ডের পাশাপাশি স্বেচ্ছায় এই ডিজিটাল তথ্য দিয়ে নিজের ভালো ড্রাইভিং রেকর্ড প্রমাণ করার সুযোগ পাবেন।

এই বিলের পক্ষের কর্মীরা বলছেন, আর্থিক সুবিধার বিষয়টি সামনে থাকলে চালকরা সাবধানে গাড়ি চালাবেন, যা সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে সাহায্য করবে। ক্যালিফোর্নিয়ার সেনেট কমিটির শুনানিতে কেলি মন্টালভো নামের এক মা অশ্রুসিক্ত চোখে জানান, ২০২০ সালে টেক্সট করতে করতে গাড়ি চালানো এক চালকের ধাক্কায় তার ২১ বছর বয়সী ছেলে বেনজামিন প্রাণ হারায়। ওই চালকের আগেও একাধিক দুর্ঘটনার রেকর্ড ছিল। কেলি বলেন, বিমা কোম্পানি যদি আগে থেকেই প্রযুক্তির মাধ্যমে তার ওপর নজর রাখত, তবে হয়তো তার সন্তান আজ বেঁচে থাকত।

বিলের মূল উদ্যোক্তা, ইঙ্গলউডের ডেমোক্র্যাট সদস্য টিনা ম্যাককিনর জানান, বিগত কয়েক বছরে তিনিও তার তিন বন্ধুকে সড়ক দুর্ঘটনায় হারিয়েছেন। তার মতে, টেলিম্যাটিক্স ভালো ড্রাইভিং আচরণকে উৎসাহিত করার একটি চমৎকার হাতিয়ার। ‘সেফার স্ট্রিটস ফর এভরিওয়ান’ নামক একটি অলাভজনক সংস্থাও এই বিলের সহ-পৃষ্ঠপোষকতা করছে। সংস্থার নির্বাহী পরিচালক ড্যামিয়ান কেভিট নিজের পা হারিয়েছেন এক সড়ক দুর্ঘটনায়। তিনি বিমা শিল্পের অর্থায়নে পরিচালিত দুটি গবেষণার সূত্র দিয়ে বলেন, আর্থিক পুরষ্কারের ব্যবস্থা থাকলে চালকদের মোবাইল ব্যবহারের প্রবণতা কমে। তবে শুনানিতে অংশ নেওয়া কোনো পক্ষই এই প্রযুক্তির কার্যকারিতা নিয়ে স্বাধীন বা নিরপেক্ষ কোনো গবেষণার তথ্য উপস্থাপন করতে পারেনি।

অন্য দিকে, ক্যালিফোর্নিয়ার বিমা বিভাগ এই বিলের কঠোর বিরোধিতা করছে। ডেপুটি ইন্স্যুরেন্স কমিশনার জোসেফাইন ফিগুয়েরো জানিয়েছেন, এই বিলটি ক্যালিফোর্নিয়ার ঐতিহাসিক বিমা আইন ‘প্রপোজিশন ১০৩’ (Proposition 103)-এর পরিপন্থী। ১৯৮৮ সালে ভোটারদের ৫১ শতাংশ ভোটে পাস হওয়া এই আইনে ভালো চালকদের জন্য ২০ শতাংশ বাধ্যতামূলক ছাড়ের নিয়ম রয়েছে। ফিগুয়েরো সতর্ক করে বলেন, এই বিল পাস হলে বিমা কোম্পানিগুলো গ্রাহকের তথ্যের সুরক্ষা না দিয়ে তৃতীয় পক্ষের অনিয়ন্ত্রিত ভেন্ডরদের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করবে, যা বড় ধরনের আইনি জটিলতা তৈরি করবে। তা ছাড়া, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা অ্যালগরিদমের মাধ্যমে মানুষের জাতিগত বা এলাকাভিত্তিক বৈষম্য তৈরির আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

গবেষণার ডেটা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই প্রযুক্তি ব্যবহারে গ্রাহকদের আর্থিক লাভ কতটা হবে তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। মেরিল্যান্ড ইন্স্যুরেন্স অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের ২০২৩ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, টেলিম্যাটিক্স ব্যবহারকারী চালকদের মধ্যে মাত্র ৩১ শতাংশের বিমা খরচ কমেছে। বিপরীতে ২৪ শতাংশ চালকের খরচ উল্টো বেড়েছে এবং ৪৫ শতাংশের ক্ষেত্রে কোনো পরিবর্তন আসেনি। এছাড়া, ‘কনজিউমার রিপোর্টস’-এর ২০২৪ সালের একটি জরিপে দেখা যায়, এর মাধ্যমে বার্ষিক গড় সাশ্রয় মাত্র ১২০ ডলার, তবে সেখানেও অনেক চালকের খরচ বৃদ্ধির প্রমাণ মিলেছে।

‘কনজিউমার ওয়াচডগ’-এর নির্বাহী পরিচালক কারমেন বালবার এই বিলটি আনার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি একে একটি ‘গাট-অ্যান্ড-অ্যামেন্ড’ বা ভিন্ন উদ্দেশ্যে দ্রুত পাস করানোর চেষ্টা হিসেবে অভিহিত করেছেন, যার ফলে সাধারণ মানুষ ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো প্রতিক্রিয়া জানানোর জন্য মাত্র এক সপ্তাহের মতো সময় পেয়েছে। রাজ্য নির্বাচনী তহবিল ও প্রচারণার রেকর্ড বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বিলের সমর্থক বিমা শিল্প গ্রুপগুলোর কাছ থেকে ২০২২ সাল থেকে এ পর্যন্ত টিনা ম্যাককিনর প্রায় ৩৮,০০০ ডলার এবং সেনেটর স্টিভ প্যাডিলা ও ক্রিস্টোফার ক্যাবালডনও মোটা অঙ্কের নির্বাচনী অনুদান পেয়েছেন, যা এই বিলের পেছনে বিমা কোম্পানিগুলোর লবিংয়ের প্রভাবকে স্পষ্ট করে তোলে।

এসিএলইউ (ACLU) ক্যালিফোর্নিয়া অ্যাকশন এবং টেকইকুইটি অ্যাকশনের মতো মানবাধিকার ও গ্রাহক অধিকার সংগঠনগুলো উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছে, যেখানে ক্যালিফোর্নিয়ায় বিমা করা আইনত বাধ্যতামূলক, সেখানে টিকে থাকার জন্য সাধারণ মানুষ বাধ্য হয়ে নিজের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বিমা কোম্পানির কাছে বিক্রি করে দেবে। প্রাইভেসী রাইটস ক্লিয়ারিংহাউসের প্রতিনিধি বেকা ক্রেমার স্পষ্টভাবে কমিটিকে বলেছেন, ক্যালিফোর্নিয়ার নাগরিকদের সংবিধানে ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকার দেওয়া হয়েছে। একটি বাধ্যতামূলক আইনি সেবা পাওয়ার জন্য নাগরিকদের মৌলিক অধিকার ও অর্থের মধ্যে যেকোনো একটিকে বেছে নিতে বাধ্য করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

মন্তব্য করুন