কর্মী ছাঁটাই ঠেকাতে ২০২৬ পর্যন্ত বেকারত্ব বিমা বাড়াল চীন

বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দা ও অভ্যন্তরীণ শ্রমবাজারের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এক যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছে চীন সরকার। ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ পর্যন্ত দেশটিতে বিদ্যমান বেকারত্ব বিমা সংক্রান্ত বেশ কিছু বিশেষ ব্যবস্থার মেয়াদ বাড়ানোর ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এই নীতির মূল উদ্দেশ্য হলো—প্রতিষ্ঠানগুলোকে কর্মী ছাঁটাইয়ে নিরুৎসাহিত করা, যুবকদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বর্তমান জনবলের দক্ষতা বৃদ্ধি করা। চীনের মানবসম্পদ ও সামাজিক নিরাপত্তা মন্ত্রণালয়সহ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ চারটি বিভাগ যৌথভাবে এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করছে বলে দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদসংস্থা সিনহুয়া নিশ্চিত করেছে।

নতুন এই নির্দেশনার ফলে যেসব কোম্পানি তাদের কর্মী ছাঁটাইয়ের হার সর্বনিম্ন পর্যায়ে রাখবে বা কোনো কর্মী ছাঁটাই করবে না, তারা বড় ধরনের আর্থিক সুবিধা পাবে। নিয়মানুযায়ী, এই যোগ্য প্রতিষ্ঠানগুলো আগের বছর পরিশোধ করা বেকারত্ব বিমা প্রিমিয়ামের একটি বড় অংশ সরকারের কাছ থেকে রিফান্ড বা ফেরত পাবে। এই রিফান্ড ব্যবস্থা চালু রাখার মাধ্যমে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো আর্থিক স্বস্তি পাবে এবং তারা কর্মীদের চাকরি টিকিয়ে রাখতে আরও বেশি আগ্রহী হবে বলে মনে করছেন দেশটির নীতিনির্ধারকেরা।

যুব কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়নে নগদ প্রণোদনা

কর্মী ধরে রাখার পাশাপাশি নতুন কর্মসংস্থান তৈরি, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের চাকরি নিশ্চিত করতে চীন সরকার একটি বিশেষ এককালীন ভর্তুকি বা সাবসিডি কর্মসূচির মেয়াদও ২০২৬ সাল পর্যন্ত বাড়িয়েছে। এই খাতের নিয়ম অনুযায়ী, কোনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বা সামাজিক সংগঠন যদি সদ্য বিশ্ববিদ্যালয় পাস করা স্নাতক কিংবা ১৬ থেকে ২৪ বছর বয়সী নিবন্ধিত কোনো বেকার তরুণকে চাকরি দেয়, তবে প্রতিটি নতুন নিয়োগের বিপরীতে সরকার ওই প্রতিষ্ঠানকে নগদ আর্থিক অনুদান দেবে। এর ফলে একদিকে যেমন উচ্চশিক্ষিত তরুণদের বেকারত্বের হার কমবে, অন্যদিকে প্রতিষ্ঠানগুলোও নতুন কর্মী নিয়োগে উৎসাহিত হবে।

একই সাথে বৃদ্ধি করা হয়েছে দক্ষতা উন্নয়ন খাতের বিশেষ অনুদান ব্যবস্থার মেয়াদও। আগের তুলনায় এবার এই সুবিধার আওতা আরও বাড়ানো হয়েছে, যাতে দেশের একটি বিশাল অংশের সাধারণ শ্রমিক ও পেশাদার কর্মীরা এই সুবিধার সুবিধাভোগী হতে পারেন। এই প্রণোদনার মাধ্যমে কর্মীরা আধুনিক প্রযুক্তির সাথে তাল মিলিয়ে নিজেদের নতুন নতুন কাজ ও দক্ষতায় পারদর্শী করে তোলার সুযোগ পাবেন, যা পরোক্ষভাবে চীনের সামগ্রিক উৎপাদনশীলতা বাড়িয়ে দেবে।

এক নজরে চীনের নতুন বেকারত্ব বিমা নীতি ও সুবিধা সমূহ

ক্রিয়াকলাপের ক্ষেত্রনতুন নীতিমালা ও সরকারি প্রণোদনা (২০২৬ পর্যন্ত বর্ধিত)
মূল লক্ষ্যকর্মী ছাঁটাই হ্রাস, যুব কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ও দক্ষতা উন্নয়ন
যৌথ ঘোষণাকারীমানবসম্পদ ও সামাজিক নিরাপত্তা মন্ত্রণালয়সহ সরকারের ৪টি বিভাগ
বীমা প্রিমিয়াম রিফান্ডকর্মী ছাঁটাই সর্বনিম্ন রাখলে আগের বছরের প্রিমিয়ামের অংশ ফেরত পাবেন মালিকেরা
যুব কর্মসংস্থান ভর্তুকিসদ্য স্নাতক ও ১৬-২৪ বছর বয়সী বেকারদের নিলে মিলবে এককালীন অর্থ
দক্ষতা বৃদ্ধি অনুদানশ্রমিকদের নতুন প্রযুক্তি শেখাতে সরকারি সহায়তার পরিধি ও আওতা বৃদ্ধি
তহবিল ব্যবস্থাপনাবেকারত্ব বিমা তহবিলের সার্বিক তদারকি আরও শক্তিশালী ও স্বচ্ছ করা
বেকারদের সুবিধাযোগ্য ব্যক্তিদের নিয়মিত মূল বেকার ভাতা এবং চিকিৎসা বিমা সুবিধা প্রদান

তহবিল ব্যবস্থাপনা ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিতের তাগিদ

সরকারের এই নতুন নির্দেশনায় শুধু প্রণোদনা দেওয়াই নয়, বরং বেকারত্ব বিমা তহবিলের সার্বিক ব্যবস্থাপনা আরও শক্তিশালী ও স্বচ্ছ করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় নির্দেশনায় স্পষ্ট বলা হয়েছে যে, এই তহবিল থেকে যোগ্য ব্যক্তিদের মূল সামাজিক সুবিধাসমূহ যেন কোনো ধরনের বিঘ্ন ছাড়াই নিয়মিত পরিশোধ করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে অস্থায়ী বেকার ভাতা এবং সুবিধাভোগীদের জন্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসা বিমা সুবিধা নিশ্চিত করা।

অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট: বৈশ্বিক অর্থনৈতিক শ্লথগতির কারণে অনেক দেশেই যখন বড় বড় প্রতিষ্ঠান থেকে গণহারে কর্মী ছাঁটাইয়ের খবর আসছে, তখন চীনের এই দীর্ঘমেয়াদি নীতি বেশ ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এটি শুধু করপোরেট খাতের লোকসান কমাবে না, বরং সাধারণ মানুষের চাকরি ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিতের মাধ্যমে দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে দারুণ ঢাল হিসেবে কাজ করবে।

মন্তব্য করুন