মাটির নিচে আকস্মিকভাবে শুরু হওয়া ধারাবাহিক দুটি শক্তিশালী কম্পনে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে ভেনেজুয়েলা। প্রথমে ৭.২ মাত্রার তীব্র ভূমিকম্প এবং এর মাত্র ৪০ সেকেন্ডের কম ব্যবধানে ৭.৫ মাত্রার আরেকটি প্রলয়ঙ্করী কম্পন দেশটিকে স্তব্ধ করে দেয়। অত্যন্ত অল্প সময়ের ব্যবধানে পরপর দুটি বড় ধাক্কায় মুহূর্তের মধ্যে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক সংস্থার (ইউএসজিএস) তথ্যমতে, এটি ছিল মূলত একটি অগভীর স্ট্রাইক-স্লিপ ধরনের ভূমিকম্প। এই প্রকৃতির ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ভূ-পৃষ্ঠের কাছাকাছি হওয়ায় এর ধ্বংসাত্মক শক্তি সরাসরি ও তীব্রভাবে উপরিভাগে আঘাত হানে, যার ফলে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা মুহূর্তের মধ্যে বহুগুণ বেড়ে যায়। মূল ভূমিকম্পের পর থেকে এখন পর্যন্ত শতাধিক আফটারশক বা মৃদু অনুকম্পন রেকর্ড করা হয়েছে। অনবরত এই কম্পনগুলোর কারণে ধসে পড়া ধ্বংসস্তূপের মাঝে উদ্ধার অভিযান চালানো এবং জরুরি পুনরুদ্ধার কাজ মারাত্মকভাবে ব্যাহত ও দীর্ঘায়িত হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক ঝুঁকি বিশ্লেষণ ও বিপর্যয় মূল্যায়ন প্রতিষ্ঠান ভেরিস্ক-এর প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে ভেনেজুয়েলার মোট অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ ১০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। তবে এই বিশাল আর্থিক ক্ষতির ঠিক কত অংশ বীমা কাভারেজের আওতাভুক্ত, তা এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এই তীব্র অনিশ্চয়তা এখন শুধু ভেনেজুয়েলার অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতেই স্থবিরতা আনেনি, বরং বৈশ্বিক পুনঃবীমা (রিয়েল এস্টেট ও গ্লোবাল রেইন্সিউরেন্স) খাতেও বড় ধরনের চাপ ও অস্থিরতা তৈরি করেছে।
ভূমিকম্পের পর স্যাটেলাইট থেকে প্রাপ্ত ছবি ও তথ্য বিশ্লেষণে ধ্বংসযজ্ঞের যে চিত্র সামনে এসেছে তা অত্যন্ত ভয়াবহ। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, দেশজুড়ে প্রায় ৫৮ হাজারেরও বেশি ভবন ও স্থাপনা আংশিক বা সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে হাজার হাজার আবাসিক ভবন, বড় বড় হাসপাতাল, গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, বিমানবন্দর এবং রাষ্ট্রীয় পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা। দেশের প্রধান প্রধান অর্থনৈতিক ও জনবহুল অঞ্চল—কারাকাস, লা গুয়াইরা, পুয়ের্তো কাবেয়ো, ভ্যালেন্সিয়া এবং পেতারে অঞ্চলে ধ্বংসের মাত্রা সবচেয়ে বেশি।
এই প্রলয়ঙ্করী দুর্যোগের প্রভাব সরাসরি পড়েছে লাখ লাখ মানুষের জীবনের ওপর। প্রাথমিক সরকারি ও বেসরকারি হিসাব মেলালে দেখা যায়, নিহতের সংখ্যা ১,৯০০ থেকে শুরু করে ৩,৩০০-এর বেশি হতে পারে। এর বাইরে আহতের সংখ্যা ইতোমধ্যে ১০,০০০ ছাড়িয়ে গেছে এবং ধসে পড়া ভবনের নিচে এখনও অনেক মানুষ নিখোঁজ থাকায় হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। জাতিসংঘের মানবিক সহায়তাবিষয়ক সংস্থাগুলোর মতে, বর্তমানে ভেনেজুয়েলার প্রায় ৬.৮ মিলিয়ন মানুষ তীব্রভাবে জরুরি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন। দুর্গত এলাকাগুলোতে খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, জরুরি ওষুধ ও অস্থায়ী আশ্রয়ের চাহিদা প্রতি মুহূর্তে বাড়ছে, যা দেশটিকে একটি দীর্ঘমেয়াদি মানবিক সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
ভেনেজুয়েলার অর্থনীতি রাজনৈতিক ও অভ্যন্তরীণ নানা কারণে আগে থেকেই চরম চাপের মধ্যে ছিল। লাগামহীন উচ্চ মূল্যস্ফীতি, স্থানীয় মুদ্রার ক্রমাগত অবমূল্যায়ন এবং এককভাবে তেলনির্ভর অর্থনৈতিক কাঠামোর কারণে দেশটির এমনিতেই পুনর্গঠন বা দুর্যোগ সামাল দেওয়ার সক্ষমতা সীমিত। এই ভূমিকম্প বিদ্যমান সেই ভঙ্গুর ও দুর্বল অর্থনৈতিক কাঠামোর ওপর এক চরম মরণকামড় বসাল।
দুর্যোগের এই কঠিন বাস্তবতায় দেশের অভ্যন্তরীণ বীমা খাতও বড় সংকটের মুখে পড়েছে। ভেনেজুয়েলায় বর্তমানে ৩০ থেকে ৪০টি বীমা কোম্পানি সক্রিয় থাকলেও সামগ্রিক বাজার অত্যন্ত ছোট এবং বিচ্ছিন্ন। দেশের বীমা খাতের প্রধান নিয়ন্ত্রক সংস্থা ‘সুদেআসেগ’ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাজ করার চেষ্টা করলেও দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক মন্দা এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে তাদের কার্যকারিতা ও বৈদেশিক লেনদেনের সক্ষমতা একেবারেই সীমিত। সবচেয়ে বড় চিন্তার বিষয় হলো, ভেনেজুয়েলায় সাধারণ মানুষের মধ্যে বীমা করার প্রবণতা বা ইন্স্যুরেন্স পেনিট্রেশন মাত্র ১% থেকে ২%। এর অর্থ হলো, দেশের সিংহভাগ সাধারণ জনগণ ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী কোনো ধরনের বীমা কাভারেজের আওতায় নেই। ফলে এই বিশাল ধ্বংসযজ্ঞের পর তারা সরকারি বা আন্তর্জাতিক সাহায্য ছাড়া নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারবেন না।
দেশটির শীর্ষস্থানীয় বীমা কোম্পানিগুলোর মধ্যে মারকান্তিল সেগুরোস, ম্যাপফ্রে ভেনেজুয়েলা, কারাকাস সেগুরোস এবং হোরিজোন্তে সেগুরোস অন্যতম। তবে এত বড় মাত্রার জাতীয় বিপর্যয় একযোগে সামলানোর মতো আর্থিক ও কৌশলগত সক্ষমতা এই প্রতিষ্ঠানগুলোর নেই। একদিকে সীমিত কাভারেজ, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক পুনঃবীমা পাওয়ার ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা ও আইনি জটিলতা এবং বর্তমান পরিস্থিতিতে ক্ষতিগ্রস্ত সম্পদের সঠিক মূল্যায়ন করার সমস্যার কারণে পুরো প্রক্রিয়াটি আরও জটিল রূপ নিয়েছে। এই ভূমিকম্প এখন আর কেবল একটি প্রাকৃতিক বিপর্যয় হিসেবে সীমাবদ্ধ নেই; এটি ভেনেজুয়েলার জন্য একাধারে তীব্র অর্থনৈতিক ধাক্কা, নজিরবিহীন মানবিক সংকট এবং দেশটির প্রাতিষ্ঠানিক ও বীমা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার এক নির্মম বাস্তব চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে।
