দেশের বিমা খাতের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত সমস্যা দূর করতে এবং গ্রাহকদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে কড়া অবস্থান নিয়েছে বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)। সংস্থাটি জানিয়েছে, বর্তমানে ৫৬ শতাংশে থাকা বিমা দাবি নিষ্পত্তির হার বাড়িয়ে কমপক্ষে ৭৫ শতাংশে উন্নীত করার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা হাতে নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে বিমা কোম্পানিগুলোর কাছে প্রায় সাত হাজার কোটি টাকার বিশাল অঙ্কের বকেয়া দাবি পড়ে আছে, যা দ্রুত পরিশোধের জন্য কাজ করে যাচ্ছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা।
রাজধানীর আইডিআরএ কার্যালয়ে সোমবার আয়োজিত এক বিশেষ অনুষ্ঠানে এই তথ্য জানান সংস্থাটির চেয়ারম্যান মীর নাদিয়া নিভিন। চলতি বছরের জুলাই মাসে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই গ্রাহকের দীর্ঘদিনের জমে থাকা বৈধ দাবি দ্রুত পরিশোধ করাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হিসেবে বেছে নিয়েছেন তিনি। বকেয়া পরিশোধের গতি বাড়াতে ইতোমধ্যে একটি দ্বিমুখী কৌশল গ্রহণ করা হয়েছে। এর আওতায় বিমা কোম্পানিগুলোর শীর্ষ নির্বাহী ও মালিকদের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক করা হচ্ছে এবং আর্থিক সংকটে থাকা কোম্পানিগুলোর ওপর কঠোর নজরদারি বজায় রাখা হয়েছে। তবে এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো সময়ের কথা জানানো হয়নি।
অনুষ্ঠানে দ্বিতীয় ধাপের বিশেষ উদ্যোগের অংশ হিসেবে পাঁচটি জীবন বিমা কোম্পানির ৫ হাজার ৮৬৮ জন গ্রাহকের হাতে প্রায় ২৩ কোটি চার লাখ টাকার দীর্ঘদিনের বকেয়া দাবি পরিশোধ করা হয়। কোম্পানিগুলোর সম্পদ বিক্রি এবং নিরাপত্তা জামানত এনক্যাশ করার মাধ্যমে এই তহবিল সংগ্রহ করা হয়েছে বলে আইডিআরএ প্রধান জানান। দেশের মোট ৮২টি বিমা কোম্পানির মধ্যে প্রায় আটটি জীবন বিমা কোম্পানি মারাত্মক আর্থিক জটিলতায় রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে শৃঙ্খলা ফেরাতে আলাদাভাবে কাজ করা হচ্ছে। পাশাপাশি মাঝারি সমস্যায় থাকা কোম্পানিগুলোকেও কড়া নজরদারির আওতায় এনে দ্রুত দাবি পরিশোধের জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছে।
এদিকে সোমবার আইডিআরএ কার্যালয় পরিদর্শন করেন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বিমা খাতে সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়াতে আইডিআরএ-র চলমান সংস্কার উদ্যোগগুলোর ভূয়সী প্রশংসা করেন তিনি। মন্ত্রী বলেন, গ্রাহকদের ন্যায্য পাওনা পরিশোধ করার মাধ্যমেই কেবল বিমা খাতের ওপর মানুষের হারিয়ে যাওয়া আস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব। সরকার ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি ব্যবস্থা চালুর মাধ্যমে বিমা খাতকে আরও গতিশীল ও কার্যকর করতে সম্পূর্ণ সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে। গ্রাহক স্বার্থ রক্ষা এবং সচেতনতা বৃদ্ধির ওপরও বিশেষ জোর দেন তিনি।
দ্বিতীয় ধাপে কোন কোম্পানি কত টাকা পরিশোধ করেছে, তার একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ নিচে দেওয়া হলো:
| বিমা কোম্পানির নাম | উপকৃত গ্রাহক সংখ্যা | পরিশোধিত দাবির পরিমাণ (টাকায়) |
| পদ্মা ইসলামী লাইফ ইনস্যুরেন্স | ৩,৬০০ | ১২ কোটি |
| হোমল্যান্ড লাইফ ইনস্যুরেন্স | ১,১৪৫ | ৪ কোটি ৯৮ লাখ |
| ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইনস্যুরেন্স | ৫৮০ | ৫ কোটি |
| সানফ্লাওয়ার লাইফ ইনস্যুরেন্স | ৩০০ | ৫৫ লাখ ৩০ হাজার |
| সানলাইফ ইনস্যুরেন্স | ২৪৩ | ৫০ লাখ ১০ হাজার |
| বৈরা লাইফ (প্রথম ধাপ) | নির্দিষ্ট পুলের অন্তর্ভুক্ত | প্রথম ধাপে পরিশোধিত |
| গোল্ডেন লাইফ (প্রথম ধাপ) | নির্দিষ্ট পুলের অন্তর্ভুক্ত | প্রথম ধাপে পরিশোধিত |
| প্রগ্রেসিভ লাইফ (প্রথম ধাপ) | নির্দিষ্ট পুলের অন্তর্ভুক্ত | প্রথম ধাপে পরিশোধিত |
| অন্যান্য বিমা প্রতিষ্ঠান (প্রথম ধাপ) | যৌথ পুলের অংশ | ১৪ কোটি ৫১ লাখ (মোট প্রথম ধাপ) |
| মোট পরিশোধিত দ্বিতীয় ধাপ | ৫,৮৬৮ | ২৩ কোটি ৪ লাখ |
উল্লেখ্য, এর আগে গত ৩ সেপ্টেম্বর প্রথম ধাপে সাতটি জীবন বিমা কোম্পানির ২ হাজার ৫৪৯ জন গ্রাহকের প্রায় ১৪ কোটি ৫১ লাখ টাকার বকেয়া দাবি পরিশোধের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। আইডিআরএ চেয়ারম্যান জানিয়েছেন, বৈধ অথচ দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা প্রতিটি দাবি যাচাই-বাছাই করে পরিশোধের এই প্রক্রিয়া ধারাবাহিকভাবে চলমান থাকবে।
