গত ২৯ জুন থেকে ৩ জুলাই পর্যন্ত বৈশ্বিক বীমা শিল্পে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন নজরে এসেছে। মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনায় সামুদ্রিক বীমার প্রিমিয়াম বৃদ্ধি, আন্ডাররাইটিংয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ব্যবহার দ্রুত বাড়া, বিলাসবহুল ঘড়ি হারানো ও চুরির বীমা দাবির ঊর্ধ্বগতি, দক্ষিণ কোরিয়ার বীমা খাতের আর্থিক স্থিতিশীলতা নিয়ে ইতিবাচক পূর্বাভাস, ভারতে হোম লোন বীমার চাহিদা বৃদ্ধি এবং সিঙ্গাপুরে পারিবারিক দায়বদ্ধতার কারণে আর্থিক পরিকল্পনা পিছিয়ে যাওয়ার মতো বিষয়গুলো স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, বিশ্ব বীমা শিল্প দ্রুত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের মধ্যেও সামুদ্রিক বীমা কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। তবে পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালিতে নিরাপত্তা ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় জাহাজ এবং পণ্য পরিবহনের বীমা প্রিমিয়াম উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশ্ব বাণিজ্যের একটি বড় অংশ এই নৌপথের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় পরিস্থিতির প্রভাব পড়ছে আন্তর্জাতিক পরিবহন ও বীমা বাজারে। ঝুঁকি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বীমা কোম্পানিগুলোও তাদের প্রিমিয়াম কাঠামো পুনর্বিবেচনা করছে।
অ্যালিয়াঞ্জ রিসার্চের সেফটি অ্যান্ড শিপিং রিভিউ ২০২৬ অনুযায়ী, বর্তমানে পারস্য উপসাগরে ১০০ গ্রস টনের বেশি ধারণক্ষমতার প্রায় ১ হাজার ১৫০টি কার্গো জাহাজ স্বাভাবিক নৌ চলাচল পুনরায় শুরু হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। এসব জাহাজে প্রায় ২ কোটি ৯০ লাখ গ্রস টন পণ্য রয়েছে, যার আনুমানিক মূল্য ১২৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এই দীর্ঘ অপেক্ষা বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং সামুদ্রিক বীমা খাতের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে।
অন্যদিকে, বীমা শিল্পে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। বিশেষ করে আন্ডাররাইটিং বিভাগে এআই এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বাজারে প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি, মুনাফার ওপর চাপ এবং দ্রুত ও নির্ভুল ঝুঁকি মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তার কারণে প্রতিষ্ঠানগুলো প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকছে। সোলার্স কনসালটিংয়ের এক বৈশ্বিক গবেষণায় দেখা গেছে, বর্তমানে প্রতি পাঁচটি বীমা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে দুটি তাদের আন্ডাররাইটিং কার্যক্রমে এআই ব্যবহার করছে। আগে যেখানে ডিজিটাল রূপান্তরের ক্ষেত্রে এই বিভাগ তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে ছিল, এখন সেখানে বিনিয়োগ দ্রুত বাড়ছে।
এদিকে বিলাসবহুল ঘড়ি হারানো ও চুরির ঘটনায় বীমা দাবির সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। দ্য ওয়াচ রেজিস্টার পরিচালিত এক জরিপে দেখা যায়, গত তিন বছরে এশিয়ায় এ ধরনের দাবির পরিমাণ গড়ে ২১ শতাংশ বেড়েছে, যা বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় সর্বোচ্চ। একই সময়ে বৈশ্বিক গড় ছিল ১৭ শতাংশ। এশিয়া, ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র ও মধ্যপ্রাচ্যের ১০০ জন বীমা ক্ষয়ক্ষতি মূল্যায়নকারী এবং দাবি ব্যবস্থাপকের অংশগ্রহণে পরিচালিত এই গবেষণায় উচ্চমূল্যের ব্যক্তিগত সম্পদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বৃদ্ধির বিষয়টিও উঠে এসেছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার বীমা শিল্প নিয়েও ইতিবাচক পূর্বাভাস দিয়েছে ফিচ রেটিংস। সংস্থাটির মতে, তুলনামূলক উচ্চ সুদের হার বীমা কোম্পানিগুলোর মূলধন অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করবে এবং বিনিয়োগ থেকে আয় বাড়াতে সহায়তা করবে। একই সঙ্গে দায়-সম্পর্কিত আর্থিক চাপও কিছুটা কমবে। যদিও স্বল্পমেয়াদে কিছু অবাস্তবায়িত বিনিয়োগ ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েছে, তবুও সামগ্রিকভাবে খাতটির আর্থিক ভিত্তি স্থিতিশীল থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ভারতে গত পাঁচ মাসে হোম লোন বীমার গ্রহণযোগ্যতা সাত গুণ বেড়েছে। ঋণগ্রহীতারা এখন ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর না করে নিজেরাই দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক দায় সুরক্ষিত করার উদ্যোগ নিচ্ছেন। এটি ব্যক্তিগত আর্থিক পরিকল্পনা এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত।
পলিসিবাজারের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ভারতের মোট হোম লোন বীমা পলিসির ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশই বিক্রি হচ্ছে মেট্রোপলিটন শহরগুলোতে। এর মধ্যে দিল্লি-এনসিআর অঞ্চল ৮ থেকে ১০ শতাংশ অংশ নিয়ে শীর্ষে রয়েছে। মুম্বাইয়ের অবদান ৫ থেকে ৭ শতাংশ। বেঙ্গালুরু, লখনউ এবং পুনে—প্রতিটি শহরের অংশীদারিত্ব ৩ থেকে ৫ শতাংশের মধ্যে।
সিঙ্গাপুরে প্রকাশিত এক জরিপে দেখা গেছে, পারিবারিক আর্থিক দায়িত্বের কারণে অনেক মানুষ অবসর-পরবর্তী জীবন এবং বীমা পরিকল্পনা পিছিয়ে দিচ্ছেন। ম্যানুলাইফের এশিয়া কেয়ার সার্ভে ২০২৬-এ অংশ নেওয়া ১ হাজার ৭৪ জনের মধ্যে ৪৬ শতাংশ জানিয়েছেন, তারা পরিবারের আর্থিক দায়িত্ব বহন করছেন। তাদের ৬২ শতাংশের মতে, এই দায়বদ্ধতা ভবিষ্যতের জন্য পর্যাপ্ত সঞ্চয় ও বীমা পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বাধা সৃষ্টি করছে।
সব মিলিয়ে বৈশ্বিক বীমা খাত এখন এমন এক পর্যায়ে রয়েছে, যেখানে প্রযুক্তি, অর্থনীতি, ভূরাজনীতি এবং গ্রাহকদের পরিবর্তিত চাহিদা একসঙ্গে শিল্পটির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করছে। একদিকে এআই ঝুঁকি মূল্যায়ন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণকে আরও দ্রুত ও কার্যকর করছে, অন্যদিকে বৈশ্বিক অস্থিরতা ও পরিবর্তিত আর্থিক বাস্তবতা বীমা কোম্পানিগুলোকে নতুন কৌশল গ্রহণে বাধ্য করছে। ফলে আগামী বছরগুলোতে প্রযুক্তিনির্ভর সেবা, উন্নত ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং গ্রাহককেন্দ্রিক বীমা পণ্যের গুরুত্ব আরও বাড়বে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা।
