মেটলাইফের বিরুদ্ধে বিমা অর্থ আত্মসাতের চেষ্টা ও গ্রাহক হয়রানির চাঞ্চল্যকর অভিযোগ

গ্রাহকের মৃত্যুর পর ন্যায্য ৪৪ লাখ টাকার বিমা দাবি পরিশোধ না করে প্রতারণা, জালিয়াতি ও চরম হয়রানির গুরুতর অভিযোগ উঠেছে বহুজাতিক বিমা প্রতিষ্ঠান মেটলাইফ ইন্স্যুরেন্সের বিরুদ্ধে। বিমাগ্রহীতার মৃত্যুর চার বছর পেরিয়ে গেলেও মনোনীত উত্তরাধিকারী (নমিনি) তার প্রাপ্য অর্থ পাননি। উল্টো ৪৪ লাখ টাকার সুবিধার বিপরীতে মাত্র ৪৪ হাজার টাকা ফেরত দিয়ে বিমা দাবি চুকিয়ে ফেলার চতুর অপচেষ্টা চালিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের মাওলানা মোহাম্মদ আকরাম খাঁ হলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই ক্ষোভ ও অসন্তোষের কথা তুলে ধরেন বগুড়ার শান্তাহারের বাসিন্দা, মরহুম জালাল হোসেনের মেয়ে এবং বিমা পলিসির নমিনি মোছা. চুমকি আক্তার।

সংবাদ সম্মেলনে সংবাদিকদের সামনে লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করে চুমকি আক্তার জানান, তার বাবা জালাল হোসেন জীবদ্দশায় মেটলাইফ ইন্স্যুরেন্সে একটি জীবন বিমা পলিসি চালু করেন। ২০২২ সালে তিনি প্রতি মাসে প্রায় ২২ হাজার টাকা করে পরপর দুটি প্রিমিয়াম কিস্তি জমা দেওয়ার পর পরলোক গমন করেন। মৃত্যুর পর নমিনি হিসেবে তিনি মেটলাইফের যাবতীয় নিয়ম ও শর্তাবলী অনুসরণ করে প্রয়োজনীয় নথিপত্রসহ ৪৪ লাখ টাকার বিমা দাবি জমা দেন। তবে মেটলাইফ কর্তৃপক্ষ লিখিত চিঠিতে দাবি করে, পলিসি গ্রহণের সময় নাকি ভুল তথ্য দেওয়া হয়েছিল—এই অজুহাতে তারা পুরো দাবিটি বাতিল ঘোষণা করে।

ভুক্তভোগী সংবাদ সম্মেলনে উল্লেখ করেন, মেটলাইফ ছাড়া অন্য প্রতিষ্ঠানে তার বাবার জমা অর্থের ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা হয়নি। ‘গার্ডিয়ান লাইফ ইন্স্যুরেন্স’ ও ‘সোনালী ব্যাংক’-এ থাকা তার বাবার অন্য দুটি বিমা ও সঞ্চয় প্রকল্পের অর্থ কোনো জটিলতা বা হয়রানি ছাড়াই দ্রুত পরিশোধ করা হয়েছে। কেবল মেটলাইফ ইন্স্যুরেন্সই গ্রাহকের পাওনা পরিশোধ না করতে একের পর এক কৃত্রিম অজুহাত ও প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে।

ঘটনার বর্ণনা দিয়ে তিনি আরও বলেন, বিমা দাবি আদায়ে বাধ্য হয়ে তিনি আইনজীবীর মাধ্যমে মেটলাইফকে আইনি নোটিশ পাঠান। এরপর মতিঝিলে মেটলাইফের প্রধান কার্যালয়ে গিয়ে ‘আলি’ নামে এক কর্মকর্তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করলে ওই কর্মকর্তা মামলা না করার পরামর্শ দেন। সমাধান করে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে তিনি ৩০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেন এবং অর্থ হস্তান্তরের কথা বলে নতুন একটি ব্যাংক হিসাবের তথ্য সংগ্রহ করেন।

পরবর্তীতে আইনজীবীর অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে যে, মেটলাইফ কর্তৃপক্ষ মূল ৪৪ লাখ টাকার দাবির বদলে মাত্র ৪৪ হাজার টাকা পরিশোধের চতুর নথিপত্র প্রস্তুত করেছে। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা আলির নিকট জানতে চাওয়া হলে তিনি জানান, উক্ত ৪৪ হাজার টাকাই হিসাব নম্বরে জমা হবে এবং এর বেশি কিছু পাওয়া যাবে না।

সংবাদ সম্মেলনে ক্ষুব্ধ নমিনি মোছা. চুমকি আক্তার বলেন:

“আমি কখনো ৪৪ হাজার টাকা নিয়ে পুরো দাবি নিষ্পত্তিতে সম্মত হইনি। ওই টাকা ছিল কেবল আমার বাবার জমা দেওয়া প্রিমিয়ামের অর্থ। মেটলাইফ কর্তৃপক্ষ অন্যায়ভাবে কম টাকা দিয়ে মূল ৪৪ লাখ টাকার বিমা দাবি গোপন ও আত্মসাৎ করার চেষ্টা চালাচ্ছে।”

তিনি আরও জানান, প্রতারণামূলক এই চুক্তির প্রতিবাদ জানালে কর্মকর্তা আলি গ্রাহকের মূল কাগজপত্র ফেরত দিতে অস্বীকৃতি জানান এবং আদালতের শরণাপন্ন হতে বলেন। পরবর্তীতে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কর্মকর্তার নম্বর থেকে গ্রাহকের সংযোগ ব্লক করে দেওয়া হয়।

এই ঘটনায় বিমা খাতের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ‘বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ’ (আইডিআরএ)-সহ একাধিক সরকারি সংস্থায় অভিযোগ দায়ের করেও চার বছরে কোনো ফল মেলেনি বলে জানান ভুক্তভোগী। সংবাদ সম্মেলন থেকে মেটলাইফ ও দায়ী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রতারণা ও জালিয়াতির দ্রুত তদন্ত, কঠোর শাস্তি এবং ভুক্তভোগী পরিবারের প্রাপ্য ৪৪ লাখ টাকার বিমা দাবি দ্রুত আদায়ে প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপের জোর দাবি জানানো হয়।

মন্তব্য করুন