এক ছাতার নিচে বীমা ঝুঁকি: সিঙ্গাপুরের বাজারে নতুন পিসিসি ফ্রেমওয়ার্ক

বিশ্বজুড়ে প্রতিনিয়ত ব্যবসার ধরন পাল্টাচ্ছে, যার ফলে উদ্ভূত নানাবিধ ঝুঁকিগুলো এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি জটিল ও আন্তঃসম্পর্কযুক্ত হয়ে উঠেছে। এমন পরিস্থিতিতে এই জটিল ঝুঁকিগুলো নিরূপণ করা এবং সেগুলোর সঠিক মূল্য নির্ধারণ করাও বেশ কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ দূর করতে এবং বীমা খাতের আধুনিকায়নে সিঙ্গাপুরের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা ‘মনিটরি অথরিটি অব সিঙ্গাপুর’ (এমএএস) একটি নতুন আইনগত কাঠামোর প্রস্তাব করেছে। এই প্রস্তাবনার মূল উদ্দেশ্য হলো ‘প্রটেক্টেড সেল কোম্পানি’ (পিসিসি) নামক একটি নতুন ধরনের করপোরেট কাঠামো প্রবর্তন করা, যা মূলত একটি মাত্র আইনি সত্তা বা প্রতিষ্ঠানের অধীনে বিভিন্ন ধরনের বীমা ঝুঁকি আলাদাভাবে পরিচালনা করতে সাহায্য করবে।

বর্তমানে সিঙ্গাপুরে প্রচলিত যে করপোরেট বা প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো রয়েছে, সেখানে প্রতিটি আলাদা ঝুঁকি বা কভারেজ প্রোগ্রামের জন্য ভিন্ন ভিন্ন আইনি প্রতিষ্ঠান খোলার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এর ফলে প্রতিটি ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার জন্য পৃথক মূলধন, সম্পদ এবং দায়-দেনার হিসাব রাখতে হয়, যা বেশ ব্যয়বহুল এবং জটিল প্রক্রিয়া। এমএএসের নতুন প্রস্তাবিত পিসিসি মডেলটি কার্যকর হলে একটি মূল বা কেন্দ্রীয় কাঠামোর (সেন্ট্রাল কোর) অধীনে বেশ কয়েকটি আলাদা উপ-বিভাগ বা সেল (কোষ) তৈরি করা সম্ভব হবে। এর মাধ্যমে কোম্পানিগুলো একই ছাতার নিচে থেকে প্রতিটি সেলের সম্পদ ও দায় সম্পূর্ণ আলাদা রেখে নিজস্ব ঝুঁকিগুলো দক্ষভাবে পরিচালনা করতে পারবে। এই পদক্ষেপটি মূলত ‘ক্যাপটিভ ইন্স্যুরেন্স’ (প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব বীমা ব্যবস্থা) এবং বিকল্প ঝুঁকি স্থানান্তর বা অল্টারনেটিভ রিস্ক ট্রান্সফার (এআরটি) প্রক্রিয়াকে শক্তিশালী করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

সিঙ্গাপুরের উপ-প্রধানমন্ত্রী গান কিম ইয়ং গত জুন মাসে ‘অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস ইন সিঙ্গাপুর’-এর বার্ষিক নৈশভোজে প্রথম এই ধরনের একটি যুগান্তকারী ফ্রেমওয়ার্ক চালুর আভাস দিয়েছিলেন। তিনি তখন এশিয়ার বীমা খাতের একটি বড় ঘাটতির কথা তুলে ধরেন। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এশিয়ার একটি বিশাল জনগোষ্ঠী এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এখনো পর্যাপ্ত বীমা সুবিধার বাইরে রয়ে গেছে। উদাহরণস্বরূপ, বিগত ২০২৫ সালে পুরো এশিয়া অঞ্চল জুড়ে বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে প্রায় ৮৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছিল। অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় হলো, এই বিশাল আর্থিক ক্ষতির ৯০ শতাংশেরও বেশি অংশ কোনো বীমা কভারেজের আওতায় ছিল না। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত দেশ ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজেদের তহবিল থেকেই এই বিশাল লোকসান গুণতে হয়েছে।

এই বিশাল বীমা ঘাটতি পূরণ করতে এবং বিকল্প ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার সমাধানগুলোকে আরও বড় পরিসরে ছড়িয়ে দিতেই এমএএস এই নতুন আইনের খসড়া বা পরামর্শপত্র (কনসালটেশন পেপার) প্রকাশ করেছে। সংস্থাটি মনে করে, পিসিসি কাঠামোটি চালু হলে তা কেবল সাধারণ বীমা ব্যবস্থাপনাই সহজ করবে না, বরং ইন্স্যুরেন্স-লিঙ্কড সিকিউরিটিজ (আইএলএস) এবং বিভিন্ন দেশের সরকারি বা সার্বভৌম ঝুঁকি তহবিল (সোভরেইন রিস্ক পুল) গঠনেও বড় ধরনের ভূমিকা রাখবে।

প্রস্তাবিত এই আইনগত কাঠামোকে আরও নিখুঁত ও বাস্তবসম্মত করতে এমএএস সংশ্লিষ্ট অংশীজন, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং আগ্রহী সাধারণ জনগণের কাছ থেকে মতামত ও পরামর্শ আহ্বান করেছে। এই খসড়া প্রস্তাবনার ওপর যেকোনো ধরনের গঠনমূলক মন্তব্য বা ফিডব্যাক জমা দেওয়ার শেষ সময় নির্ধারণ করা হয়েছে আগামী ২০২৬ সালের ৭ আগস্ট পর্যন্ত। সকলের মতামত যাচাই-বাছাই করে পরবর্তী সময়ে এই আইন চূড়ান্ত করা হবে।

মন্তব্য করুন