ভারতের তিন রাষ্ট্রায়ত্ত সাধারণ বিমা সংস্থা—ন্যাশনাল ইনস্যুরেন্স কোম্পানি (NICL), ওরিয়েন্টাল ইনস্যুরেন্স কোম্পানি (OICL) এবং ইউনাইটেড ইন্ডিয়া ইনস্যুরেন্স কোম্পানি (UICL)—এর আর্থিক সংকট কাটাতে নতুন কৌশল নিয়েছে দেশটির কেন্দ্রীয় সরকার। এবার শুধু বড় অঙ্কের মূলধন জোগান দিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলোর ঘাটতি পূরণ করতে চাইছে না সরকার। বরং পরিচালনাগত ও আর্থিক কার্যক্রমে দৃশ্যমান উন্নতি হলে পরবর্তী ধাপে কত অর্থ এবং কখন দেওয়া হবে, তা নির্ধারণের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ‘Business Standard’-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিন রাষ্ট্রায়ত্ত বিমা সংস্থার জন্য তৈরি করা পুনরুদ্ধার পরিকল্পনায় আন্ডাররাইটিং ব্যবস্থার সংস্কার, নতুন বিমা পণ্য চালু, ঝুঁকি মূল্যায়নে প্রযুক্তির ব্যবহার এবং কর্মীদের কর্মদক্ষতাভিত্তিক ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ, সরকারি সহায়তার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসায়িক কাঠামোতেও পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
Table of Contents
মূলধন পেয়েও ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি তিন সংস্থা
ন্যাশনাল ইনস্যুরেন্স, ওরিয়েন্টাল ইনস্যুরেন্স ও ইউনাইটেড ইন্ডিয়া ইনস্যুরেন্স—তিনটিই বর্তমানে লোকসানের মধ্যে রয়েছে। তাদের সলভেন্সি রেশিওও নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্ধারিত মাত্রার তুলনায় অনেক নিচে নেমে গেছে।
ভারতের রিজার্ভ ব্যাংক (RBI) ২০২৬ সালের জুনে প্রকাশিত ফিন্যান্সিয়াল স্ট্যাবিলিটি রিপোর্টে এই তিন রাষ্ট্রায়ত্ত সাধারণ বিমা সংস্থার আর্থিক দুর্বলতাকে দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য উদ্বেগের বিষয় হিসেবে উল্লেখ করেছে। অন্যদিকে, রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের আরেক সাধারণ বিমা সংস্থা নিউ ইন্ডিয়া অ্যাস্যুরেন্স এখনও লাভজনক অবস্থানে রয়েছে।
এর আগে ২০২০ থেকে ২০২২ অর্থবছরের মধ্যে তিন প্রতিষ্ঠানকে আর্থিকভাবে শক্তিশালী করতে ভারত সরকার মোট ১৭ হাজার ৪৫০ কোটি রুপি মূলধন দিয়েছিল। এর মধ্যে ন্যাশনাল ইনস্যুরেন্স পেয়েছিল ৯ হাজার ২৭৫ কোটি রুপি, ওরিয়েন্টাল ইনস্যুরেন্স ৪ হাজার ৪২০ কোটি এবং ইউনাইটেড ইন্ডিয়া ইনস্যুরেন্স পেয়েছিল ৩ হাজার ৭৫৫ কোটি রুপি।
তবে ওই অর্থ দেওয়ার পরও প্রতিষ্ঠানগুলোর সলভেন্সি পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। বরং ২০২৬ অর্থবছরের শেষে তিন সংস্থার অবস্থান আরও দুর্বল হয়েছে।
ইউনাইটেড ইন্ডিয়ার সলভেন্সি রেশিও এক বছরের ব্যবধানে মাইনাস ৬৫ শতাংশ থেকে নেমে মাইনাস ১৩৬ শতাংশ হয়েছে। ন্যাশনাল ইনস্যুরেন্সের ক্ষেত্রে এটি মাইনাস ৬৭ শতাংশ থেকে কমে মাইনাস ১১১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে ওরিয়েন্টাল ইনস্যুরেন্সের সলভেন্সি রেশিও মাইনাস ১০৩ শতাংশ থেকে নেমে মাইনাস ১৬৩ শতাংশ হয়েছে।
ভারতের বিমা নিয়ন্ত্রক সংস্থা ইন্স্যুরেন্স রেগুলেটরি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অথরিটি অব ইন্ডিয়া (IRDAI) অনুযায়ী, একটি বিমা প্রতিষ্ঠানের ন্যূনতম সলভেন্সি রেশিও ১৫০ শতাংশ থাকা প্রয়োজন। এই সূচক মূলত ভবিষ্যতে গ্রাহকদের বিমা দাবি ও অন্যান্য আর্থিক দায় পরিশোধের জন্য প্রতিষ্ঠানের হাতে পর্যাপ্ত সক্ষমতা রয়েছে কি না, তার ধারণা দেয়।
আন্ডাররাইটিং লোকসানও বেড়েছে
তিন প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সংকটের আরেকটি বড় কারণ তাদের আন্ডাররাইটিং ব্যবসায় ধারাবাহিক লোকসান। ২০২৬ অর্থবছরে সরকারি খাতের মাল্টিলাইন সাধারণ বিমা সংস্থাগুলোর সম্মিলিত আন্ডাররাইটিং লোকসান আগের অর্থবছরের তুলনায় ৫৮ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়ে ২৯ হাজার ৭০ কোটি ৫৭ লাখ রুপিতে পৌঁছেছে।
ইউনাইটেড ইন্ডিয়ার আন্ডাররাইটিং লোকসান ১১৩ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ৮ হাজার ৩৩৫ কোটি ৭০ লাখ রুপি। ওরিয়েন্টাল ইনস্যুরেন্সের লোকসান ৮৪ শতাংশ বেড়ে ৭ হাজার ৩০৭ কোটি ৭৭ লাখ রুপিতে দাঁড়িয়েছে। ন্যাশনাল ইনস্যুরেন্সের আন্ডাররাইটিং লোকসানও প্রায় ৬ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ৪ হাজার ৬২৫ কোটি ১৬ লাখ রুপি।
এই পরিস্থিতিতে নতুন করে সরকারি অর্থ দেওয়ার আগে প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসা পরিচালনার ধরন, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং আর্থিক ফলাফল নিয়মিত পর্যবেক্ষণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আগামী কয়েকটি প্রান্তিকে তাদের অগ্রগতি পর্যালোচনা করে পরবর্তী মূলধন সহায়তার পরিমাণ ও সময় নির্ধারণ করা হতে পারে।
প্রতিষ্ঠানগুলোকে ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে কর্মদক্ষতা পর্যালোচনার পাশাপাশি নিজেদের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনাও শক্তিশালী করার নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে।
এনএসইর শেয়ার বিক্রিতে নজর
তিন রাষ্ট্রায়ত্ত বিমা সংস্থার হাতে থাকা ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জের (NSE) শেয়ারও আর্থিক পুনর্গঠনে ভূমিকা রাখতে পারে। তিন প্রতিষ্ঠান মিলিয়ে এনএসইর ৯ কোটি শেয়ার রয়েছে।
এর মধ্যে ১ কোটি ৪৯ লাখ ৬০ হাজার শেয়ার ১ হাজার ৭৮৫ রুপি দর ধরে বিক্রির জন্য বাজারে আনার পরিকল্পনা রয়েছে। এর আগে ১ কোটি ৮০ লাখ শেয়ার বিক্রির পরিকল্পনা করা হলেও পরবর্তী সময়ে প্রস্তাবিত শেয়ারের পরিমাণ কমানো হয়েছে।
রেটিং সংস্থা Icra-এর হিসাব অনুযায়ী, বর্তমান ব্যবসায়িক প্রবণতা ও সলভেন্সি পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্ধারিত ন্যূনতম সলভেন্সি রেশিও অর্জনের জন্য তিন প্রতিষ্ঠানকে ২০২৭ সালের মার্চের মধ্যে প্রায় ৩৯ হাজার কোটি রুপি প্রয়োজন হতে পারে।
প্রযুক্তিনির্ভর বিমা ব্যবস্থায় জোর
সরকারের পরিকল্পনায় শুধু মূলধন জোগানের বিষয়টি নেই। বিমা ব্যবসার মৌলিক কাঠামোতেও পরিবর্তন আনার কথা বলা হয়েছে।
গ্রাহকের ঝুঁকি আরও নির্ভুলভাবে মূল্যায়ন করে বিমা পোর্টফোলিও পুনর্বিন্যাস, প্রযুক্তিনির্ভর আন্ডাররাইটিং এবং নতুন ধরনের বিমা পণ্য তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে যেসব গ্রাহক ও বাজার এখনও পর্যাপ্ত বিমা সুরক্ষার আওতায় আসেনি, তাদের জন্য নতুন পণ্য তৈরির সুযোগ খোঁজা হচ্ছে।
ঝুঁকি মূল্যায়নে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI ব্যবহারের বিষয়টিও পরিকল্পনায় রয়েছে। প্রচলিত অ্যাকচুয়ারিয়াল মডেলের পাশাপাশি AI ব্যবহার করে গ্রাহকের ঝুঁকি ও প্রোফাইল বিশ্লেষণ এবং সম্ভাব্য ক্ষতি কমানোর উপায় শনাক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে।
কৃষিবিমার মতো সরকারি প্রকল্পে আবহাওয়া-সংক্রান্ত ইন্টারনেট অব থিংস (IoT) ডেটা ও স্যাটেলাইট চিত্র ব্যবহার করেও ঝুঁকি নির্ধারণের সুযোগ রয়েছে। এতে বিমা দাবি ও সম্ভাব্য ক্ষতির পূর্বাভাস দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব হতে পারে।
দক্ষ কর্মী ধরে রাখাও বড় চ্যালেঞ্জ
রাষ্ট্রায়ত্ত বিমা সংস্থাগুলোর জন্য মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনাও এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ভারতের বিমা বাজারে নতুন প্রতিযোগীদের প্রবেশের ফলে অভিজ্ঞ ও দক্ষ কর্মীদের ধরে রাখা সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য কঠিন হচ্ছে।
লোকসানের কারণে কর্মীদের পারিশ্রমিক ও প্রণোদনার সুযোগ সীমিত থাকায় দক্ষ জনবল হারানোর ঝুঁকিও বাড়ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাই কর্মীদের কর্মদক্ষতাভিত্তিক ব্যবস্থাপনা এবং প্রতিভাবান জনবল ধরে রাখার বিষয়টিকে পুনরুদ্ধার পরিকল্পনার অংশ করা হচ্ছে।
General Insurance Council-এর তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে তিন রাষ্ট্রায়ত্ত বিমা সংস্থার সম্মিলিত নিট লোকসান হয়েছে ৩১ হাজার ২০০ কোটি ৮৬ লাখ রুপি। শুধু ২০২৬ অর্থবছরেই তাদের সম্মিলিত নিট লোকসান সর্বোচ্চ ১১ হাজার ৪৩৪ কোটি ৩৮ লাখ রুপিতে পৌঁছেছে। একই সময়ে তাদের নিট ইনকার্ড ক্লেইমস রেশিওও ধারাবাহিকভাবে ১০০ শতাংশের কাছাকাছি বা তার ওপরে ছিল।
ফলে এবার সরকারের পরিকল্পনা শুধু অর্থের জোগান দিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলোকে টিকিয়ে রাখা নয়। ন্যাশনাল ইনস্যুরেন্স, ওরিয়েন্টাল ইনস্যুরেন্স ও ইউনাইটেড ইন্ডিয়া ইনস্যুরেন্সকে নিজেদের আন্ডাররাইটিং লোকসান কমানো, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা উন্নত করা, পরিচালনাগত দুর্বলতা কাটানো এবং মানবসম্পদ কাঠামো শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে অগ্রগতি দেখাতে হবে। সেই অগ্রগতির ভিত্তিতেই পরবর্তী সরকারি মূলধন সহায়তার সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
