সংক্ষিপ্ত সময়ে বদলাচ্ছে বীমা দাবি নিষ্পত্তির চিত্র

একসময় বীমা খাতে দাবি নিষ্পত্তির দীর্ঘসূত্রতা ছিল গ্রাহকদের অন্যতম বড় অসন্তোষের কারণ। সড়ক দুর্ঘটনা, অগ্নিকাণ্ড, প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা অন্য কোনো ক্ষয়ক্ষতির পর বীমার অর্থ পেতে অনেককেই দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে হতো। ক্ষতিগ্রস্ত স্থানে সার্ভেয়ারের উপস্থিতি, পরিদর্শন, প্রতিবেদন প্রস্তুত, নথি যাচাই এবং প্রশাসনিক অনুমোদনের মতো একাধিক ধাপ পেরিয়ে একটি সাধারণ দাবি নিষ্পত্তি করতে প্রায়ই সাত থেকে ১৪ দিন, কখনও তারও বেশি সময় লাগত।

প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির ফলে সেই প্রচলিত পদ্ধতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বীমা খাতে এখন দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে ‘রিমোট ক্লেইম অ্যাসেসমেন্ট’ বা দূরবর্তী দাবি মূল্যায়ন ব্যবস্থা। এই পদ্ধতিতে গ্রাহক ক্ষতিগ্রস্ত সম্পদের ছবি, ভিডিও কিংবা সরাসরি ভিডিও ধারণ করে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে বীমা প্রতিষ্ঠানে পাঠান। এরপর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কম্পিউটার ভিশন এবং স্বয়ংক্রিয় বিশ্লেষণ প্রযুক্তির সমন্বয়ে তথ্য যাচাই করে প্রাথমিক মূল্যায়ন সম্পন্ন করা হয়। ফলে আগে যেখানে কয়েক দিন সময় লাগত, সেখানে অনেক দাবি কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই নিষ্পত্তির পথে এগিয়ে যাচ্ছে। সহজ ধরনের কিছু দাবির ক্ষেত্রে কয়েক মিনিটের মধ্যেই অনুমোদনের প্রক্রিয়াও সম্পন্ন করা সম্ভব হচ্ছে।

বীমা খাতের বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি কেবল একটি নতুন প্রযুক্তিনির্ভর সেবা নয়; বরং দাবি মূল্যায়নের পুরো কাঠামোতেই মৌলিক পরিবর্তন এনে দিচ্ছে। আগে প্রায় প্রতিটি দাবির ক্ষেত্রেই সার্ভেয়ারকে ঘটনাস্থলে যেতে হতো। এখন অধিকাংশ প্রাথমিক মূল্যায়ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মেই সম্পন্ন করা যাচ্ছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক শিল্প বিশ্লেষণে দেখা গেছে, আধুনিক ডিজিটাল দাবি ব্যবস্থাপনা চালুর ফলে দাবি নিষ্পত্তির সময় গড়ে ৭০ থেকে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত কমে এসেছে।

গ্রাহকদের অভিজ্ঞতায়ও এসেছে বড় পরিবর্তন। দুর্ঘটনার পর সপ্তাহের পর সপ্তাহ অপেক্ষার পরিবর্তে এখন অনেক দাবি ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই নিষ্পত্তি হচ্ছে। কম ঝুঁকির এবং সহজ প্রকৃতির দাবিগুলোতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক স্বয়ংক্রিয় অনুমোদন ব্যবস্থা ব্যবহারের কারণে মানুষের সরাসরি হস্তক্ষেপ ছাড়াই পুরো প্রক্রিয়া শেষ করা সম্ভব হচ্ছে। এতে গ্রাহক যেমন দ্রুত ক্ষতিপূরণ পাচ্ছেন, তেমনি বীমা প্রতিষ্ঠানের সেবার গতি ও দক্ষতাও বাড়ছে।

যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, জাপান, চীন, অস্ট্রেলিয়া এবং ভারতসহ উন্নত ও উদীয়মান বহু দেশের বীমা বাজারে ইতোমধ্যে এই প্রযুক্তির ব্যবহার দ্রুত বিস্তৃত হয়েছে। ইনসুরটেক প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন শিল্প গবেষণা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, এসব দেশে কয়েক মিলিয়নেরও বেশি দাবি দূরবর্তী মূল্যায়ন ব্যবস্থার মাধ্যমে নিষ্পত্তি হয়েছে। ডিজিটাল সেবার প্রতি গ্রাহকদের আস্থা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

রিমোট ক্লেইম অ্যাসেসমেন্টের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো সময় সাশ্রয়, ব্যয় হ্রাস এবং পুরো প্রক্রিয়ার সরলীকরণ। আগে একটি সাধারণ দাবি নিষ্পত্তিতে যেখানে এক থেকে দুই সপ্তাহ সময় লাগত, সেখানে আধুনিক ডিজিটাল ব্যবস্থায় তা নেমে এসেছে এক থেকে দুই দিনে। এতে গ্রাহক দ্রুত আর্থিক সহায়তা পাচ্ছেন এবং বীমা কোম্পানিগুলোর প্রশাসনিক চাপও উল্লেখযোগ্যভাবে কমছে।

গ্রাহকসেবার ক্ষেত্রেও এসেছে নতুন মাত্রা। অনেক প্রতিষ্ঠান এখন মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে দাবি জমা দেওয়া, প্রয়োজনীয় নথি আপলোড, আবেদনটির অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ এবং চূড়ান্ত অর্থপ্রদানের সুবিধা দিচ্ছে। ফলে গ্রাহকদের আর বারবার শাখা কার্যালয়ে যেতে হচ্ছে না বা দীর্ঘ সময় ধরে কাগজপত্র জমা দেওয়ার ঝামেলা পোহাতে হচ্ছে না। আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্লেষণেও দেখা গেছে, ডিজিটাল দাবি ব্যবস্থার ফলে গ্রাহক সন্তুষ্টির হার বেড়েছে এবং অভিযোগের সংখ্যা কমেছে।

এই ব্যবস্থার কার্যকারিতার পেছনে একাধিক আধুনিক প্রযুক্তি একসঙ্গে কাজ করছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ক্ষতির প্রাথমিক মূল্য নির্ধারণে সহায়তা করে, কম্পিউটার ভিশন ছবির সূক্ষ্ম তথ্য বিশ্লেষণ করে ক্ষতির মাত্রা শনাক্ত করে এবং স্বয়ংক্রিয় সফটওয়্যার প্রয়োজনীয় তথ্য যাচাই করে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভূমিকা রাখে। বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা দুর্গম এলাকায় ক্ষয়ক্ষতির ক্ষেত্রে ড্রোনের মাধ্যমে আকাশপথ থেকে ছবি সংগ্রহ করা হয়। আবার বন্যা বা ঘূর্ণিঝড়ের মতো পরিস্থিতিতে স্যাটেলাইটচিত্র বিশ্লেষণ করে বিস্তৃত এলাকার ক্ষয়ক্ষতির মূল্যায়ন করা সম্ভব হচ্ছে।

প্রযুক্তিনির্ভর এই পরিবর্তন বীমা কোম্পানিগুলোর পরিচালন ব্যয়ও কমিয়ে আনছে। মাঠপর্যায়ে পরিদর্শন, যানবাহন পরিচালনা এবং লজিস্টিক ব্যয়ের প্রয়োজন কমে যাওয়ায় বিভিন্ন শিল্প প্রতিবেদনে দাবি ব্যবস্থাপনার ব্যয় ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমার তথ্য উঠে এসেছে। একই অবকাঠামো ব্যবহার করেই প্রতিষ্ঠানগুলো এখন আগের তুলনায় বেশি সংখ্যক গ্রাহককে দ্রুত সেবা দিতে পারছে।

প্রথমদিকে অনেকের ধারণা ছিল, দূরবর্তী দাবি মূল্যায়ন চালু হলে প্রতারণার ঝুঁকি বাড়তে পারে। কিন্তু বাস্তবে উন্নত নিরাপত্তা প্রযুক্তির কারণে পরিস্থিতি ভিন্ন চিত্র দেখাচ্ছে। বর্তমানে ছবি ও ভিডিওর জিও-ট্যাগিং, ধারণের সময়সংক্রান্ত তথ্য, মেটাডেটা যাচাই এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রতারণা শনাক্তকরণ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। এর ফলে কোনো ছবি কোথায়, কখন এবং কীভাবে ধারণ করা হয়েছে, তা যাচাই করা সম্ভব হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব প্রযুক্তি জালিয়াতি শনাক্তের সক্ষমতাও আগের তুলনায় আরও শক্তিশালী করেছে।

পরিবেশগত দিক থেকেও এই প্রযুক্তির ইতিবাচক প্রভাব রয়েছে। মাঠপর্যায়ে যাতায়াত কমে যাওয়ায় জ্বালানির ব্যবহার হ্রাস পাচ্ছে এবং যানবাহন থেকে কার্বন নিঃসরণও কমছে। পরিবেশ, সামাজিক দায়বদ্ধতা ও সুশাসনভিত্তিক বিভিন্ন বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রতিটি দাবি ডিজিটালভাবে নিষ্পত্তি করা গেলে গড়ে প্রায় ৮ থেকে ১০ কেজি কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমন কমানো সম্ভব।

বাংলাদেশেও ধীরে ধীরে বীমা খাতে ডিজিটাল সেবার বিস্তার ঘটছে। কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে মোবাইলভিত্তিক দাবি গ্রহণ এবং প্রাথমিক প্রক্রিয়াকরণের সুবিধা চালু করেছে। তবে পূর্ণাঙ্গ রিমোট ক্লেইম অ্যাসেসমেন্ট ব্যবস্থা এখনো সীমিত পরিসরে রয়েছে। বীমা খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএ ধাপে ধাপে ডিজিটাল রূপান্তরের উপযোগী নীতিমালা উন্নয়নের উদ্যোগ নিয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত অবকাঠামো, দক্ষ জনবল এবং উপযুক্ত নীতিগত সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে ভবিষ্যতে এই ব্যবস্থা আরও বিস্তৃত হবে।

বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়নে, রিমোট ক্লেইম অ্যাসেসমেন্ট এখন আর পরীক্ষামূলক কোনো ধারণা নয়; এটি বৈশ্বিক বীমা শিল্পের দ্রুত বিকাশমান একটি কার্যকর বাস্তবতা। দ্রুত সেবা, ব্যয় সাশ্রয়, স্বচ্ছতা এবং গ্রাহকবান্ধব প্রক্রিয়ার সমন্বয়ে এই প্রযুক্তি বীমা খাতকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছে। সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হলো, ক্ষতিপূরণ পেতে দীর্ঘ অপেক্ষার পরিবর্তে এখন প্রযুক্তির সহায়তায় বীমা সেবা দ্রুত পৌঁছে যাচ্ছে গ্রাহকের হাতের মুঠোয়।

মন্তব্য করুন